রোজিনা ইসলাম, ঢাকা০২ নভেম্বর ২০১৮, ২৩:৪৬
আপডেট: ০৩ নভেম্বর ২০১৮, ১০:৪৭

ক্রেস্টে সোনা জালিয়াতি

ক্রেস্টে সোনা জালিয়াতি

এত বড় জালিয়াতির ঘটনায় পাঁচ বছরেও বিচার না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন মুক্তিযোদ্ধাসহ বিশিষ্টজনেরা।

মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা বিদেশি বন্ধু ও সংগঠনকে দেওয়া স্বর্ণের ক্রেস্টে জালিয়াতির ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের কারও শাস্তি হয়নি। এ ঘটনায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠিত প্রথম তদন্ত কমিটি সাবেক প্রতিমন্ত্রীসহ ১৩ জন কর্মকর্তা এবং দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটিকে দায়ী করেছিল। এরপর বিষয়টি আর এগোয়নি। এত বড় জালিয়াতির ঘটনায় পাঁচ বছরেও বিচার না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন মুক্তিযোদ্ধাসহ বিশিষ্টজনেরা।জালিয়াতির এ ঘটনায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি পৃথক তিনটি তদন্ত কমিটি করেছিল। দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) ঘটনার তদন্তে অনুসন্ধান কমিটি করেছিল। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও সংসদীয় কমিটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল। কিন্তু প্রতিবেদনে যাঁদের নাম এসেছিল শেষ পর্যন্ত তাঁদের কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

২০১৪ সালের ৬ এপ্রিল প্রথম আলোয় ‘ক্রেস্টের স্বর্ণের ১২ আনাই মিছে!’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখার জন্য বিদেশি বন্ধু ও সংগঠনকে দেওয়া স্বর্ণের ক্রেস্ট পরীক্ষা করে দেখা গেছে, তাতে ১ ভরি বা ১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রাম সোনা থাকার কথা থাকলেও ছিল মাত্র ২ দশমিক ৩৬৩ গ্রাম সোনা (সোয়া ৩ আনা)। অর্থাৎ ১ ভরি সোনার মধ্যে প্রায় ১২ আনাই নেই।

জালিয়াতিতে জড়িতদের কেন শাস্তি হয়নি, জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা একবার তদন্ত করিয়েছি। যারা দোষী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছি। শাহবাগ থানায় মামলা করেছি। কিন্তু আমাদের কাছে কেউ কিছু জানতে চায়নি। তাহলে আমরা আর কী করব?’

২০১১ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু ৩৩৮ জন বিদেশি ব্যক্তিত্ব ও সংগঠনকে সম্মাননা জানায় সরকার। অন্য উপহারসামগ্রীর সঙ্গে তাঁদের একটি করে ক্রেস্ট দেওয়া হয়। বাংলাদেশ স্বাধীনতা সম্মাননা, বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা ও মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা—এই তিন শ্রেণিতে সম্মাননা দেওয়া হয়। তখন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ছিলেন এ বি তাজুল ইসলাম।

ক্রেস্টে স্বর্ণের জালিয়াতির বিষয়টি ফাঁস হলে প্রথমে ঢাকার তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনারকে দিয়ে তদন্ত করায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। তদন্ত কমিটি সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এ বি তাজুল ইসলাম, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব কে এইচ মাসুদ সিদ্দিকীসহ ১৩ জন কর্মকর্তা এবং দুটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করে প্রতিবেদন দেয়।

তবে তদন্ত প্রতিবেদন জমা (২০১৪ সালের মে মাসে) হওয়ার পর বিভাগীয় কমিশনার পর্যায়ের কর্মকর্তাকে দিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অভিযোগের তদন্ত করানো নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অভিযুক্ত প্রতিমন্ত্রী ও সচিবরা। এরপর একই বছর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে তৎকালীন অর্থসচিব হেদায়েতুল্লাহ আল-মামুনকে প্রধান করে আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। ওই কমিটি দীর্ঘ দুই বছর তদন্ত করার পর কমিটির এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তোলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।

মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, সংসদীয় কমিটির তদন্তে স্বার্থের সংঘাত (কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট) ছিল। সংসদীয় কমিটির প্রধান এ বি তাজুল ইসলাম তদন্তের নির্দেশ দেন। অথচ কেলেঙ্কারির ঘটনার সময় তিনিই ছিলেন প্রতিমন্ত্রী। মন্ত্রণালয়ের তদন্তে তাঁকে দায়ী করা হয়েছিল। সংসদীয় কমিটি এক বছর তদন্ত করার পর যে প্রতিবেদন দেয় তাতে তাজুল ইসলামের নাম ছিল না। প্রতিবেদনে ক্রেস্ট তৈরির বিষয়ে অবহেলা ও অনিয়ম এবং ক্রেস্ট পরীক্ষার প্রতিবেদন গোপন করায় মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব কে এইচ মাসুদ সিদ্দিকী, যুগ্ম সচিব

আবুল কাসেম তালুকদার, উপসচিব এনামুল কবির ও শাখা সহকারী আবুল কাসেমকে (ভারপ্রাপ্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তা) দায়ী করা হয় এবং তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।

ক্রেস্টে জালিয়াতির ঘটনায় ২০১৪ সালের ২ জুন বিষয়টি অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিষয়টি আর এগোয়নি।

ক্রেস্ট জালিয়াতির ঘটনায় সরবরাহকারী দুটি প্রতিষ্ঠানের মালিকের বিরুদ্ধে ২০১৪ সালের ১০ জুন প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে শাহবাগ থানায় মামলা করেছিল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এতে ক্রেস্ট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এমিকনের মালিক মীর দাউদ আহমেদ ওরফে নাজিম এবং মেসার্স মহসিনুল হাসানের স্বত্বাধিকারী মো. মোহসিনুল হাসানকে আসামি করা হয়। পুলিশ জানায়, দুজনই জামিনে আছেন।

এদিকে মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ হারানো ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের আত্মত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবে তাদের পরিবারকে সম্মাননা দেওয়ার সিদ্ধান্ত সরকার নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে ক্রেস্ট বানানোর জন্য গত আগস্ট পর্যন্ত চার দফা দরপত্র ডাকা হলেও কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখায়নি বলে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান।

এত বড় জালিয়াতির বিচার না হওয়ার বিষয়ে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনাটি খুবই লজ্জার ও স্পর্শকাতর। সরকারের সবাই খুব ভালোভাবেই জানে, কারা এ ঘটনায় জড়িত। তারপরও তাঁদের বিচারের আওতায় না আনা সন্দেহজনক।