রোজিনা ইসলাম, ঢাকা০৫ নভেম্বর ২০১৮, ১১:৪৮ 
আপডেট: ০৬ নভেম্বর ২০১৮, ১৩:৪৪

৯৯৯ নম্বরে সেবা। গতকাল রাজধানীর আবদুল গণি রোডে পুলিশ কন্ট্রোল রুম।  প্রথম আলো

৯৯৯ নম্বরে সেবা। গতকাল রাজধানীর আবদুল গণি রোডে পুলিশ কন্ট্রোল রুম। প্রথম আলো

  • কার্যক্রম পরিচালিত হয় আবদুল গণি রোডের পুলিশ কন্ট্রোল রুম থেকে
  • ১০ মাসে সেবা পেতে ৬৬ লাখ ৯৭ হাজার ১৮০ জন ফোন দিয়েছেন
  • আর জরুরি সেবা নিয়েছেন প্রায় ১২ লাখ মানুষ
  • পুলিশের সহায়তা চেয়েই বেশির ভাগ ফোন আসে

গত ২ অক্টোবর, সন্ধ্যা ৭টা ২০ মিনিট। জাতীয় জরুরি সেবার ৯৯৯ নম্বরে ফোন করলেন আকতারুল ইসলাম। তিনি সাতক্ষীরা সদরের ভোমরা সীমান্ত এলাকায় থাকেন। সীমান্ত দিয়ে দুজন নারীকে পাচারের প্রক্রিয়া চলছিল। সময় কম, সঙ্গে সঙ্গে ৯৯৯-এ ফোন। সেখান থেকে খবর চলে যায় সদর থানায়। দুজন পুলিশ কর্মকর্তা গিয়ে ঘটনার সত্যতা পান। উদ্ধার হন ওই দুই নারী। আটক হয় তিন পাচারকারী।আকতারুল ইসলাম প্রথম আলোকে বললেন, শুনেছিলেন যে ৯৯৯ নম্বরে ফোন করলে দ্রুত সহযোগিতা পাওয়া যায়। কিন্তু ফোন করার ৩০ মিনিটের মধ্যেই যে পুলিশ ঘটনাস্থলে চলে আসে, যা তাঁর কাছে ছিল অবিশ্বাস্য। আবার ফোনটি করতে কোনো খরচও হয়নি।

আরেকটি উদাহরণ দেওয়া যায়। ৬ অক্টোবর মিরপুর থেকে জরুরি পুলিশি সেবার ৯৯৯–এ ফোন করে জানানো হয়, একটি শিশুকে অপহরণ করে নিয়ে যাচ্ছে একটি চক্র। তাৎক্ষণিক ৯৯৯ অপারেটর পল্লবী থানায় ফোন করে বিষয়টি জানিয়ে দেন। ফোন পেয়ে সাত বছর বয়সী রাইশা নামের এক শিশুকে উদ্ধার করে। আটক হয় আসামি।

৯৯৯–এ ফোন করে এই তথ্যটি দিয়েছিলেন আবদুল কামাল। কী ভেবে তিনি ৯৯৯ তে ফোন করলেন জানতে চাইলে প্রথম আলোকে বলেন, ‘মানুষ হিসেবে মনে করেছি ওই সময় কিছু একটা করা দরকার। আর তখনই মনে হয়েছে ৯৯৯ সেবার কথা।’ একইভাবে গত ১৩ ও ১৬ সেপ্টেম্বর রংপুর ও কুমিল্লায় ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশের সহায়তায় থামানো হয় বাল্যবিবাহ। এ রকম গল্প আছে অসংখ্য।

জরুরি সেবা ৯৯৯ তে কাজ করেন এমন কর্মকর্তারা প্রথম আলোকে জানান, প্রাণনাশের আশঙ্কা, ধর্ষণ–সংক্রান্ত ঘটনা, গৃহকর্মী নির্যাতন, কাউকে আটকে রাখা, লিফটে আটকে পড়া, অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকা, দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা, অ্যাম্বুলেন্স, পারিবারিক সমস্যা সমাধান, নিখোঁজ শিশু উদ্ধার, গাছ কাটা বন্ধ করা, শব্দদূষণ ছিনতাইসহ নানা ধরনের সমস্যায় সাধারণ ও বিপদগ্রস্ত মানুষকে তাঁরা এ পর্যন্ত সহযোগিতা করেছেন।

মূলত ৯৯৯ নাগরিকের জরুরি যেকোনো প্রয়োজনে কোনো একটি মুঠোফোন থেকে সম্পূর্ণ টোল ফ্রি বা বিনা পয়সায় পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও অ্যাম্বুলেন্স সেবা দিয়ে থাকে। সপ্তাহে ৭ দিন ২৪ ঘণ্টা চালু থাকে এই সেবা। ৯৯৯ সার্ভিসের প্রশিক্ষিত কর্মীরা প্রয়োজন অনুযায়ী ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ বা অ্যাম্বুলেন্স সেবা প্রদানকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন। গত ১২ ডিসেম্বর এই ৯৯৯ চালু করা হয়।

জাতীয় জরুরি সেবা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১০ মাসে ৯৯৯ থেকে সেবা পেতে ৬৬ লাখ ৯৭ হাজার ১৮০ জন ফোন দিয়েছেন। এসব ফোনের মধ্য প্রায় ১০ লাখ লোকই বিভিন্ন তথ্য জানতে চেয়ে চিঠি দিয়েছেন। আর সেবা নিয়েছেন ১১ লাখ ৬২ হাজার ৪৯ জন। পুলিশের সহায়তা চেয়েই বেশির ভাগ ফোন আসে। এ ছাড়া দুর্ঘটনার খবর জানাতে ও নিরাপত্তা চেয়েও অনেক বেশি ফোন আসে।

জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯–এর কার্যক্রম পরিচালিত হয় রাজধানীর আবদুল গণি রোডের পুলিশ কন্ট্রোল রুম থেকে। কেমন চলছে এ সেবা, জানতে সরেজমিনে জরুরি সেবার কল সেন্টারে গিয়ে দেখা যায়, দুটো ফ্লোরে কাজ করেন চার শরও বেশি কর্মী। চারদিকে শুধু ফোনের ক্রিং ক্রিং শব্দে মুখর ফ্লোরগুলো। কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যাঁরা কল রিসিভ করেন, তাঁদের বলা হয় কলটেকার। ওই কলটেকারদের তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে আছেন কয়েকজন কর্মকর্তা। দিনরাত ২৪ ঘণ্টা এখানে চারটি শিফটে কাজ করেন তাঁরা। অপারেটররা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে ফোন করলে কীভাবে এই সেবা গ্রাহককে দেবেন, তা খুব সহজেই তাঁরা করতে পারছেন। অ্যাম্বুলেন্স সেবার জন্য রয়েছে আলাদা ডেস্ক।

৯৯৯ সেবার বিষয়ে ইস্কাটনের বাসিন্দা ইয়াসমিন খাতুন নামে একজন বলেন, তাঁর এক বন্ধু বিপদে পড়ার ২০ মিনিটের মধ্য তিনি এই সেবা পেয়েছেন। ওই বন্ধুর গাড়ি চুরি হয়েছিল। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত স্বপন তালুকদার জানান, গভীর রাতে গুলশান থেকে পুলিশ ধর্ষণের হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন এক নারীকে। তিনি ও তাঁর বন্ধু সেই দিন ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে সহযোগিতা চেয়েছিলেন।

তবে গত ১০ মাসে ৯৯৯ নম্বরে আসা বিরক্তিকর ফোনের সংখ্যাও কম নয়। প্রায় ৯ লাখ কল এসেছে বিভিন্ন গ্রাহকের কাছ থেকে, যাঁরা আসলে কোনো সেবা চাননি। অনেক সময় এসব কল করে নোংরা কথাও বলা হয়। এ বিষয়ে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ তে কাজ করেন, এমন চারজন কর্মী প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের কাছে প্রতিটি ফোনই গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রতিদিনই অনেক বিরক্তিকর ফোন আসে।

তবে পুলিশের পরিচালনায় এই জাতীয় জরুরি সেবা এখনো সব ধরনের সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারেনি বলে জানান জাতীয় জরুরি সেবা বিভাগের পুলিশ সুপার তবারক উল্লাহ। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘জনবল ঘাটতি রয়েছে। সব থানায় ফোন করলেই পুলিশ পাওয়া যায় না। গাড়ির স্বল্পতা রয়েছে। যাঁরা ফোন করেন, তাঁদের অবস্থান দেখতে পাওয়া যায় না। আবার যানজটের কারণে সেবা পৌঁছে দিতে অনেক সময় লেগে যায়। এসব সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারলে এই সেবা আরও জনপ্রিয়তা পাবে, মানুষকে সহযোগিতা করতে পারব।’

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী এ নিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, সরকারের খুবই ইতিবাচক উদ্যোগ। এ সেবা চালু করার সময় অনেকেই বলেছিলেন, এটা তেমন কোনো কাজে আসবে না। কিন্তু এখন প্রায়ই শুনি অনেকেই উপকৃত হয়েছেন। এ সেবাটি মানুষের আস্থার জায়গাটা করে নিতে পেরেছে। মানুষ প্রশংসা করছে। এখন দরকার হচ্ছে, ৯৯৯ তে ফোন করলে যে ধরনের সেবা পাওয়া যায়, তা মানুষকে জানাতে হবে। গণমাধ্যমে প্রত্যেকটি সফল ঘটনা তুলে ধরতে হবে। এ ছাড়া জাতীয় জরুরি সেবা কার্যালয়কে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে হবে, এই ইউনিটকে শক্তিশালী করতে যা যা প্রয়োজন, তা করতে হবে। তবেই এই উদ্যোগ সফল হবে।