নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২৩:৩০ 
আপডেট: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৮:৩৩

প্রতীকী ছবি। এএফপি

প্রতীকী ছবি। এএফপিআফ্রিকার দেশ লিবিয়ার কারাগারে বন্দী থাকা বাংলাদেশিদের নিয়মিত খাবার দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। দেশটির কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, দীর্ঘ সময়ের জন্য বাংলাদেশি বন্দীদের খাবার দিতে তারা বাধ্য নয়। নিয়মিত খাবার না পেয়ে কারাবন্দী বাংলাদেশিদের অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাঁদের মধ্যে দুজন আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন বলে বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে লিবিয়ায় সাম্প্রতিক যুদ্ধাবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সেখানে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিদের সতর্কতার সঙ্গে চলাচল করতে বলা হয়েছে। গত মঙ্গলবার লিবিয়ার ত্রিপোলির বাংলাদেশ দূতাবাস এই সতর্কতা জারি করে। সতর্কবার্তায় আরও বলা হয়েছে, জরুরি প্রয়োজনে দেশটিতে থাকা বাংলাদেশিরা যাতে দূতাবাস কর্তৃপক্ষের সহায়তা নেয়।

লিবিয়ার কারাগারে আটক বাংলাদেশিদের ফেরানোর প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ত্রিপোলিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম কাউন্সেলর এ এস এম আশরাফুল ইসলাম গতকাল বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, আটক ১৮৪ কারাবন্দীকে ফিরিয়ে আনতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা পেলে তাঁদের দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হবে। তবে ত্রিপোলির আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধ রয়েছে। ঢাকা থেকে অনুমতি পাওয়ার পর এঁদের ফেরত পাঠাতে কয়েক দিন সময় লাগবে।দালালের মাধ্যমে ইউরোপে ঢোকার চেষ্টা করা বাংলাদেশের প্রায় দুই শ নাগরিক এখন লিবিয়ার কারাগারে বন্দিজীবন কাটাচ্ছেন। তাঁরা চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুলাই মাসের মধ্যে ইউরোপে যাওয়ার উদ্দেশে সুদান, মিসর, আলজেরিয়া, দুবাই ও জর্ডান থেকে লিবিয়ায় জড়ো হয়েছিলেন। পরে সেখানে ধরা পড়েন। লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

লিবিয়ার কারাগারে আটক বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল সন্ধ্যায় পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাংলাদেশ দূতাবাস এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিষয়টি আমরা জেনেছি। দ্রুত কারাগারে আটক লোকজনকে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এদের লিবিয়া থেকে দেশে আনার খরচ দেবে।’

২০১৫ সাল থেকে লিবিয়ায় জনশক্তি রপ্তানি বন্ধ রেখেছে বাংলাদেশ সরকার। যাঁরা লিবিয়ায় গিয়ে ধরা পড়েছেন, তাঁদের কারও পাসপোর্টেই ওই দেশটির ভিসা ছিল না। জনশক্তি রপ্তানিকারকেরা বলছেন, ইউরোপে লোক পাঠাতে মানব পাচারকারীরা এখন লিবিয়াকে নিরাপদ রুট (পথ) হিসেবে ব্যবহার করছেন। দালালের মাধ্যমে যাওয়া বেশির ভাগ বাংলাদেশির চেষ্টা থাকে লিবিয়া থেকে নৌপথে ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে ইউরোপের দেশ ইতালি ও গ্রিসে ঢোকা। এ ছাড়া লিবিয়া হয়ে স্পেনে যাওয়ারও চেষ্টা করেন অনেকে। তবে লিবিয়া গিয়ে ধরা পড়েন অনেকে।

লিবিয়া উপকূল থেকে ডিঙিতে করে ইউরোপে যাওয়ার পথে বাংলাদেশি নিখোঁজ ও আটক হওয়ার কয়েকটি ঘটনা নিয়ে ওই দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস অনুসন্ধান চালায়। এতে দেখা যায়, গত ১৭ জুন ও ২৩ জুন দুটি নৌকায় থাকা ১৪৬ যাত্রীকে আটক করে লিবিয়ার কোস্টগার্ড। পরে তাঁদের দেশটির অভিবাসন সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ ছাড়া ১৯ জুন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের অভিবাসীদের একটি নৌকা সাগরে দুর্ঘটনায় পড়লে কিছু যাত্রী নিখোঁজ হন। লিবিয়ার উপকূল থেকে প্রতিবছরের মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত (সাগর অনেকটা শান্ত থাকে) ছোট নৌকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপের কয়েকটি দেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালায়।

লিবিয়ার ত্রিপোলির বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্র জানায়, বাংলাদেশিদের সঙ্গে ভারত ও পাকিস্তানি নাগরিকেরাও গত কয়েক মাসে আটক হয়েছিলেন। ওই দেশের সরকার লিবিয়ার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে নিজ নিজ দেশের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিয়ে গেছে। অথচ বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে এই বিলম্ব অনাকাঙ্ক্ষিত। লিবিয়া সরকার এখন বাংলাদেশ দূতাবাসকে বন্দীদের জন্য তিন বেলার খাবার দিতে বলেছে।

লিবিয়া দূতাবাস সূত্র জানায়, বন্দীদের দেশে পাঠানোর বিষয়টি অনির্দিষ্টকালের জন্য ঝুলে পড়েছে। এ অবস্থায় একদিকে যেমন তাঁরা দুর্ভোগের স্বীকার হচ্ছেন, অন্যদিকে লিবিয়ায় তাঁদের বিচারিক প্রক্রিয়া থেকে রেহাই পাওয়ার সুযোগ হাতছাড়া হতে বসেছে। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইএএম) সঙ্গেও দূতাবাসের সম্পর্কে টানাপোড়নের সৃষ্টি হয়েছে।

এ বিষয়ে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব নমিতা হালদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিস্তারিত কথা হয়েছে। আশা করি, দ্রুত একটি সমাধানে পৌঁছাব।’

তবে বন্দীদের স্বজনেরা (বাংলাদেশে থাকা) অভিযোগ করেছেন, পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র বা প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় লিবিয়ায় আটক বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনতে কার্যকর উদ্যোগ নিচ্ছে না। কারাগারে আটক ব্যক্তিদের পরিচয় যাচাই-বাছাইয়ের নামে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে।