ভারী বর্ষণ হলেই খুলনা নগরের বিভিন্ন জায়গায় ব্যাপক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এতে নগরবাসীর দুর্দশার সীমা থাকে না। নগরীর বাস্তুহারা কলোনি থেকে সম্প্রতি তোলা ছবি l সাদ্দাম হোসেন
রোজিনা ইসলাম ও শেখ আল-এহসান, খুলনা থেকে
১৩ জুলাই ২০১৭, ০২:০০
আপডেট: ১৩ জুলাই ২০১৭, ০২:০২

খাল দখলের কারণে একটু ভারী বৃষ্টিতেই খুলনা শহরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা হচ্ছে। আগে এসব এলাকায় পানি আটকে থাকত না।
গত কয়েক দিন বৃষ্টির সময় নগরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ব্যস্ততম রয়্যাল মোড়, শান্তিধাম মোড়, শিববাড়ি মোড়, তেঁতুলতলা মোড়, পিটিআই মোড়, মডার্ন ফার্নিচার মোড়, প্রেসক্লাব মোড়, বেনী বাবু, স্যার ইকবাল, রেলওয়ে হাসপাতাল, মিস্ত্রিপাড়া, রূপসা স্ট্যান্ড, আহসান আহম্মেদ, বাবুখান, টুটপাড়া সেন্ট্রাল ও শিপইয়ার্ড রোড, নতুন বাজার, কেডিএ অ্যাভিনিউ, খালিশপুর লাল হাসপাতাল মোড়, দেয়ানা প্রধান সড়ক, মহেশ্বরপাশা বণিকপাড়া, তেলিগাতী প্রধান সড়ক, বাদামতলা, সিমেট্রি রোডের এপিসি স্কুলের সামনের অংশ, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, মীরেরডাঙ্গা প্রধান সড়ক ও বাদামতলা কেব্‌ল শিল্প এলাকার একাংশ পানিতে তলিয়ে থাকে। সড়কের পানি নর্দমায় নামার বদলে নর্দমার পানি উপচে সড়কে উঠছে।

সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, নগরের পানি নিষ্কাশন হয় ২২টি খালের মাধ্যমে। খালগুলো নগর ও এর আশপাশে জালের মতো ছড়িয়ে রয়েছে। প্রভাবশালীরা এসব খাল দখল করে নেওয়ায় বছর বছর নতুন এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে।

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) খুলনার সভাপতি আনোয়ারুল কাদির বলেন, পরিকল্পিত ড্রেনেজব্যবস্থা না থাকা ও খালগুলো প্রভাবশালীদের অবৈধ দখলে থাকায় দিন দিন জলাবদ্ধ এলাকার পরিমাণ বাড়ছে। যেহেতু খুলনায় ওয়াসা তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে, তাই পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থাও তাদের হাতে নেওয়া উচিত।

এ ব্যাপারে খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, জলাবদ্ধতার সংজ্ঞা অনুসারে নগরে কোনো জলাবদ্ধতা নেই। কিছুক্ষণ পানি আটকে থাকে মাত্র। তা ছাড়া জলবায়ুর প্রভাবে নগরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ভৈরব নদের তলদেশ উঁচু হয়ে গেছে। এতে পানির উচ্চতাও বেড়েছে। যেহেতু নগরের পানি গিয়ে পড়ে ভৈরব নদে, তাই জোয়ারের সময় বৃষ্টি হলে পানি সরতে কিছুটা সময় লাগে। তবে আটকে থাকা বৃষ্টির পানি আরও দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য কাজ চলছে।

২০০৯ সালে খালের দখলদারদের একটি তালিকা তৈরি করেন সাবেক মেয়র তালুকদার আবদুল খালেক। ওই তালিকায় শহর ও শহরতলির ৫০টি খাল দখলের সঙ্গে ৮১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের যুক্ত থাকার তথ্য উঠে আসে। ওই তালিকায় দেখা যায় ৫০টি খালের মধ্যে ১১টির কোনো অস্তিত্ব নেই। বাকি ৩৯টি খালের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ অবৈধ দখলে রয়েছে।

খুলনা সিটি করপোরেশনের সম্পত্তি কর্মকর্তা নুরুজ্জামান তালুকদার বলেন, খাল অবৈধ দখলমুক্ত করতে সিটি করপোরেশনের অভিযান চলছে। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কারণে অনেক সময় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না। তবে যেসব জায়গায় খালের মুখ বন্ধ করে রাখা হয়েছিল তা অভিযান চালিয়ে খুলে দেওয়া হয়েছে।

জলাবদ্ধতা নিরসনে মাস্টারপ্ল্যান

বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য ২০০৯ সালে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে (এলজিইডি) একটি প্রকল্প জমা দেয় কেসিসি। মন্ত্রণালয় থেকে এ ব্যাপারে একটি মাস্টারপ্ল্যান জমা দিতে বলা হয়। ২০১১ সালে নগরের ড্রেনেজব্যবস্থার একটি মাস্টারপ্ল্যান জমা দেওয়া হয়। ওই মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী খুলনা নগরের জলাবদ্ধতার স্থায়ী নিরসনের জন্য ১ হাজার ১৬৫ কিলোমিটার নর্দমা নির্মাণ ও খালগুলো পুনঃখননের কথা বলা হয়। তা ছাড়া ৪টি শক্তিশালী পাম্প হাউস স্থাপন ও ৩৫ কিলোমিটার শহররক্ষা বাঁধ নির্মাণও ওই প্ল্যানের অন্তর্ভুক্ত। প্ল্যান বাস্তবায়নে মোট খরচ ধরা হয় ৬ হাজার কোটি টাকা। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২১ সালের মধ্যে সব কাজ শেষ করার কথা বলা হয়। ২০১২ সালের শুরুর দিকে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) প্রকল্পের আওতায় ২০০ কোটি টাকা ছাড় করে। ওই বছরই ড্রেনেজব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ শুরু করে কেসিসি।

ইতিমধ্যে প্রথম পর্যায়ের আওতায় ১২টি খাল ও ১০ কিলোমিটার শহর রক্ষাবাঁধ নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছে কেসিসি। দ্বিতীয় পর্যায়ে ১০টি খাল, ৩০টি পুকুর ও জলাশয় সংরক্ষণ, ৮০ কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণ, চারটি পাম্প হাউস, ৩টি স্লুইসগেটের উন্নয়নের কাজ রাখা আছে।

কেসিসির প্রধান প্রকল্প কর্মকর্তা আবির-উল-জব্বার বলেন, প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ হয়েছে, দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজের জন্য প্রকল্প জমা দেওয়া হয়েছে। ওই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে নগরে জলাবদ্ধতা একেবারেই থাকবে না।