ইফতেখার মাহমুদ ও রোজিনা ইসলাম
২২ জুন ২০১৭, ০৭:০০
আপডেট: ২২ জুন ২০১৭, ০৭:০০

পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ধসের কারণ হিসেবে বজ্রপাতকেও দায়ী করেছে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া অতিবৃষ্টি, নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন, অপরিকল্পিতভাবে পাহাড়ের মাটি কাটা এবং আবাসনকে পাহাড়ধসের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

পাহাড়ধসে ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে তৈরি মন্ত্রণালয়ের সংক্ষিপ্ত বিবরণে এই চিত্র পাওয়া গেছে। ১৯ জুন চূড়ান্ত করা ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই সব কারণে কেবল রাঙামাটি জেলাতেই ১৪৫টি স্থানে পাহাড়ে ধস হয়েছে।

পাহাড়ধসের বিষয়ে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পাহাড়ের মাটি মূলত বেলে-দোঁআশ প্রকৃতির। এ ধরনের মাটির আঠালো গুণাবলি নেই এবং তা শুকনো অবস্থায় কঠিন হয়ে যায়। আবার পানির সংস্পর্শে খুব নরম হয়ে যায়। মাটির পানির ধারণক্ষমতাও কম। ফলে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানিতে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ, জীবনহানি ও সম্পদের ক্ষতি হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বজ্রপাতের কারণে পাহাড়ে কম্পন সৃষ্টি হওয়া অসম্ভব। এ ধরনের ব্যাখ্যা অবৈজ্ঞানিক ও বিভ্রান্তিমূলক। তাঁরা বলছেন, মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে সেখানকার পাহাড়গুলোকে বেলে-দোঁআশ মাটি দিয়ে তৈরি বলে যে তথ্যের উল্লেখ করা হয়েছে, তা-ও সঠিক নয়। সেখানে শুধু বেলে কিংবা দোঁআশ ও মিশ্র মাটির পাহাড় রয়েছে। এ ধরনের ভুল তথ্য ও ব্যাখ্যা সমস্যাটি সমাধানের সঠিক পথের সন্ধান দেবে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার প্রথম আলোকে বলেন, পাহাড়ের সাম্প্রতিক ধসের প্রধান কারণ ভূতাত্ত্বিক। বজ্রপাতের কারণে পাহাড়ধস হয়েছে এমন মত বিভ্রান্তিকর। এই ধসের কারণ অনুসন্ধানের জন্য দেশে যাঁরা পাহাড় নিয়ে কাজ করেন, তাঁদের ডাকা হয়নি, তাঁদের মতামতও নেওয়া হয়নি। তিনি মনে করেন, পাহাড়ের ভূতাত্ত্বিক গঠনকে আমলে না নিয়ে সড়ক নির্মাণ এবং নিয়মিত ভারী যানবাহন যাতায়াতের কারণে পাহাড়গুলোর গঠন দুর্বল হয়ে যায়। বৃক্ষ নিধনের কারণে ন্যাড়া হয়ে যাওয়া পাহাড়ের ভেতরে অতিবৃষ্টিজনিত পানি ঢুকে পড়ায় বড় ধরনের ধস হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় দেশের বিশেষজ্ঞদের মতামত না চাইলেও পাহাড়ধসের বিষয়ে পরামর্শ নিতে দুটি আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতা নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। মন্ত্রণালয় পাহাড়ে উন্নয়নবিষয়ক আঞ্চলিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (ইসিমুড) ও চীনের সেংডুর চায়নিজ ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেন হেজার্ড নামের দুটি সংস্থার যৌথ বিশেষজ্ঞ দলকে দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে সমীক্ষা চালাতে চায়। মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অনুমতি চেয়েছে।

এমন উদ্যোগের বিষয়ে সাবেক প্রধান বন সংরক্ষক ইউনুস আলী প্রথম আলোকে বলেন, বন বিভাগ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের ন্যাড়া পাহাড়গুলোতে বনায়ন করতে চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অনুমতি না পাওয়ায় তা করা যায়নি। আর পাহাড়ধসের কারণ অনুসন্ধানের জন্য দেশে অনেক বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। কিন্তু ওই মন্ত্রণালয় এখনো দেশীয় বিশেষজ্ঞদের কোনো মতামত নেয়নি। তা না করেই তারা বিদেশি সংস্থার মতামত নিতে অতি উৎসাহী হয়ে উঠেছে।

পাহাড়ধসের দিনের ঘটনার বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১২ জুন সন্ধ্যায় প্রচণ্ড শব্দে বজ্রপাত শুরু হয়। প্রায় দুই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে এই বজ্রপাত চলে এবং সেই সঙ্গে প্রবল বৃষ্টিপাত হয়। এতে রাঙামাটির ১৪৫টি স্থানে পাহাড়ধস হয়। রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের ৩৭টি স্থানে ধস হয়।

প্রতিবেদনে তথ্য ও ব্যাখ্যা সম্পর্কে জানতে চাইলে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. কামালউদ্দিন তালুকদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকেই মূলত প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। বজ্রপাতের কারণে ধসের বিষয়টি স্থানীয় মানুষ বিশ্বাস করে। তাই আমরা স্থানীয় জ্ঞান হিসেবে ওই ব্যাখ্যা প্রতিবেদনে রেখেছি।’

দেশি বিশেষজ্ঞদের মতামত না নিয়ে বিদেশি সংস্থাকে নিয়ে আসার বিষয়ে কামালউদ্দিন তালুকদার বলেন, ‘চীনা সংস্থা ও ইসিমুডের পাহাড়ে ধস নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতা আছে। তারা আমাদের কাছে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে কাজ করার আগ্রহ জানিয়েছে। তাই তাদের অনুমতি দেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে। তবে তারা দেশে এলে দেশের বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার জন্য একটি বড় সেমিনার করা হবে।’

অবশ্য ব্র্যাকের জলবায়ু ও দুর্যোগ বিভাগের পরিচালক গওহর নঈম ওয়ারা প্রথম আলোকে বলেন, পাহাড়ে অবকাঠামো ও বসতি নির্মাণের ক্ষেত্রে যে ভুলগুলো হয়েছে, তা স্থানীয় জনগোষ্ঠীগুলোর পক্ষ থেকে নানাভাবে বলা হয়েছিল। কিন্তু তাদের সেসব কথা আমলে নেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ধস ও ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি করতে যে বিদেশি বিশেষজ্ঞ দল আসছে, নেতৃত্বে অবশ্যই বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞদের রাখতে হবে। বিদেশিদের পরামর্শ নিয়ে কাজ করে যদি কোনো সমস্যা হয়, তাহলে তার জবাবদিহি নিশ্চিত হবে না।