রোজিনা ইসলাম, ঢাকা ও শাহাদৎ হোসেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
০২ জুন ২০১৮, ১৩:৩০ 
আপডেট: ০৩ জুন ২০১৮, ১২:২২

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় মাদক ব্যবসা ও সরবরাহে প্রত্যক্ষÿ ও পরোক্ষভাবে তিন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ (ওসি) আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ১৬ জন জড়িত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও সদস্য, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতারা। অবশ্য তাঁরা সবাই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

সরকারের করা মাদক ব্যবসায়ী ও পৃষ্ঠপোষকদের তালিকায় এসব নাম এসেছে। এ ছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর, আশুগঞ্জ, বিজয়নগর এবং সীমান্তবর্তী আখাউড়া ও কসবার ১২৭ জন মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারির নাম রয়েছে ওই তালিকায়।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাদকের তালিকায় মাদক চোরাকারবার ও সরবরাহে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়তাকারী হিসেবে পাঁচ পুলিশ কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁরা হলেন আশুগঞ্জ থানার ওসি বদরুল আলম তালুকদার, আখাউড়া থানার ওসি মোশারফ হোসেন তরফদার, বিজয়নগর থানার ওসি আলী আর্শাদ, আশুগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মেসবাহ উদ্দিন, বিজয়নগর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কবির হোসেন। স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে মাদকের সঙ্গে তাঁদের সংশ্লিষ্টতার সত্যতা পাওয়া গেছে।থানা-পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালে কসবা থানার ওসি ছিলেন বদরুল আলম তালুকদার। সে সময় মাদক ব্যবসায়ী চক্রের সঙ্গে তাঁর সখ্য গড়ে ওঠে। এরপর সেখান থেকে কিশোরগঞ্জের ভৈরবে ওসি হিসেবে বদলি করা হয় তাঁকে। ভৈরব মাদকমুক্ত সমাজ চাই আন্দোলনের আহ্বায়ক ইমতিয়াজ আহমেদ ওসি বদরুলের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার অভিযোগ তুলেছিলেন। পুলিশ সুপারের কাছে অভিযোগ দেওয়ায় ইমতিয়াজকে মাদকের মিথ্যা মামলায় আটক করে আদালতে চালান দেন বদরুল।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বদরুল আলম বলেন, ‘সরকারের এই তালিকাটি পুলিশ সুপার তদন্ত করেছেন। মাদকের সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা থাকলে নিশ্চয়ই আমাকে এখানে রাখতেন না।’ মাদক ব্যবসায়ীদের সহায়তা করছেন কেন-জানতে চাইলে বিষয়টি ঠিক নয় বলে দাবি করেন তিনি। 
আখাউড়া থানার ওসি মোশারফ হোসেন তরফদারের ভাষ্য, ‘আমি এখানে যোগদানের পর থেকেই মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছি। আর যত দিন এই থানায় থাকব মাদকের বিরুদ্ধে কাজ করব।’

আর বিজয়নগর থানার ওসি আলী আর্শাদ বলছেন, এই থানায় যোগদানের পর থেকেই মাদকের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছেন তিনি। ২০১৬ সালের ৫ মে থেকে এ পর্যন্ত থানায় ১৭৫টি মাদকের মামলা হয়েছে। তাহলে তিনি কীভাবে জড়িত?

অভিযোগ সম্পর্কে আশুগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মেসবাহ উদ্দিন বলেন, ‘জেলার চারটি থানায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছি। মাদকের সঙ্গে আমার কোনো ধরনের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে পুলিশের চাকরি ছেড়ে দেব।’ বিজয়নগর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কবির হোসেন মাদক ব্যবসায়ীদের সহযোগিতার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইকবাল হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, মাদক চোরাকারবারে ও সরবরাহে প্রত্যক্ষÿও পরোক্ষভাবে পুলিশ সদস্যদের সহায়তার বিষয়টি তাঁরা তদন্ত করেছেন। এটা ঠিক, তালিকায় থাকা পুলিশ সদস্যদের ব্যাপারে জনগণের ধারণা ভালো নয়।

সদ্য যোগদান করা পুলিশ সুপার আনোয়ার হোসেন খান বলেন, মাদকের সঙ্গে পুলিশের সম্পৃক্ততার বিষয়ে কোনো প্রমাণ পাওয়া গেলে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ততা থাকার অভিযোগে কসবা থানার উপপরিদর্শক মনির হোসেনকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।

এ ছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকায় মাদক ব্যবসায়ী ও প্রশ্রয়দানকারী হিসেবে আখাউড়া উত্তর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান হান্নান ভূঁইয়া স্বপন, ইউপি সদস্য হান্নান মিয়া, কসবা পৌরসভার কাউন্সিলর আবু সাঈদ, কসবার বায়েক ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, একই ইউনিয়নের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আল আমিন, বায়েক ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মনিরুল হকের দুই ভাই মো. দুলু ও বাবুল হোসেনের নাম রয়েছে। এই দুই ভাই উপজেলায় বড় মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত।

আখাউড়া ও কসবায় সরেজমিনে ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, থানায় কোনো মামলা বা কোথাও নাম না থাকলেও আখাউড়া উত্তর ইউপির চেয়ারম্যান হান্নান ভূঁইয়ার পৃষ্ঠপোষকতায় সীমান্ত থেকে মাদকের বড় চালান পাচার হয়।

এ ব্যাপারে হান্নান ভূঁইয়া বলেন, ‘উপজেলার মাসিক আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বিষয়টি নিয়ে তদন্তের জন্য বলেছি। আমি কেমন, তা ওসি ও ইউএনওকে জিজ্ঞেস করেন। রাজনৈতিকভাবে হেনস্তা করার জন্য একটি পক্ষ আমার বিরুদ্ধে এসব করছে।’

স্থানীয় সূত্র জানা গেছে, আখাউড়ার ইউপি সদস্য হান্নান মিয়া গাঁজা পাচারের এক মামলায় টাকার প্রলোভন দেখিয়ে গত ১১ মার্চ সেলিম মিয়া নামে এক ব্যক্তিকে হান্নান সাজিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি আদালতে হাজির করেন। পরে আদালত সেলিম মিয়াকে হান্নান মনে করে কারাগারে পাঠান। অবশ্য পরে আদালতের বিচারিক হাকিম বিষয়টি বুঝতে পেরে কারাগারে থাকা সেলিম ও পলাতক হান্নানের বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা করেন। ইউপি সদস্য হান্নান এখনো পলাতক। এ নিয়ে গত ২৬ মার্চ প্রথম আলোতে ‘আদালতের সঙ্গে প্রতারণা করায় মামলা দায়ের’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।