আমিন হুদা

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
২৪ মে ২০১৮, ১৩:০১ 
আপডেট: ২৪ মে ২০১৮, ১৩:৩২

  • আমিন হুদা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক।
  • আমিন হুদাকে ২০০৭ সালের ২৪ অক্টোবর গ্রেপ্তার করা হয়।
  • আমিন হুদা বর্তমানে কারাগারে আছেন।
  • প্রায় সারা বছরই বিভিন্ন হাসপাতালের বিছানায় জেল খাটেন আমিন হুদা ।

‘ইয়াবাম্যান’ হিসেবে পরিচিত আমিন হুদা ৭৯ বছরের সাজাপ্রাপ্ত। কিন্তু সাজা পাওয়ার পর প্রায় অর্ধেক সময়ই পার করেছেন হাসপাতালে। তাতেও মন ভরছে না। এবার তাঁকে খুব যত্নের সঙ্গে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে বলেছে অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশন। একই সঙ্গে হাইকমিশনের দুজন কর্মকর্তাকে প্রতি মাসে একবার মাদক মামলার এই আসামির সঙ্গে দেখা করতে দিতে বলেছে।

এ মাসের শুরুতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দেওয়া চিঠিতে অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশন এই কনস্যুলার সুবিধা চেয়েছে। আমিন হুদা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক। বিদেশি নাগরিক গ্রেপ্তার হলে বা সাজাপ্রাপ্ত হলে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাস যেসব আইনি সুবিধা দেয়, সেটাই কনস্যুলার সুবিধা।

হাইকমিশনের চিঠিতে আমিন হুদার শারীরিক অবস্থার অবনতির কথা উল্লেখ করে বলা হয়, তিনি অনেক ধরনের রোগে ভুগছেন। বিশেষ করে ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ। এর আগেও তারা কনস্যুলার সুবিধা চেয়েছিল কিন্তু দেওয়া হয়নি। চিঠির সঙ্গে আমিন হুদার অস্ট্রেলিয়ার একটি পাসপোর্টের অনুলিপি দেওয়া হয়েছে। যদিও সেই পাসপোর্টের মেয়াদ ২০০৭ সালের ৭ আগস্ট শেষ হয়ে গেছে।

আমিন হুদাকে ২০০৭ সালের ২৪ অক্টোবর গুলশানের একটি বাড়ি থেকে ৩০ বোতল ফেনসিডিলসহ গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী গুলশানের আরেকটি বাসা থেকে ১৩৮ বোতল মদ, পাঁচ কেজি ইয়াবা বড়ি (সংখ্যায় ১ লাখ ৩০ হাজার) এবং ইয়াবা তৈরির যন্ত্র ও উপাদান উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের দুটি মামলায় তাঁর মোট ৭৯ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়। এরপর থেকে তিনি নামেই কারাগারে আছেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ গত সপ্তাহেও হাইকমিশন তাগাদা দিয়ে এ ব্যাপারে সরকারের সিদ্ধান্ত জানতে চেয়েছে। তবে মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা বিভাগ এ-সংক্রান্ত নথিতে আমিন হুদাকে ‘ইয়াবাম্যান’ উল্লেখ করে এ বিষয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে বলেছে।ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার সূত্র জানায়, আমিন হুদা বর্তমানে কারাগারে আছেন। তবে তাঁর শারীরিক অবস্থা ভালো নয়, এই ছুতায় এ সপ্তাহের মধ্যেই হাসপাতালে নেওয়া হবে। আরেকটি সূত্র জানায়, চিকিৎসার নামে আমিন হুদাকে দেশের বাইরে নেওয়ার কথা ভাবছে তাঁর পরিবার। সে জন্য তারা অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনের দ্বারস্থ হয়েছে। হাইকমিশনকে দিয়ে এ সুপারিশ করানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

আমিন হুদার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের চিকিৎসক বিপ্লব কান্তি বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, আমিন হুদা খুবই অসুস্থ। কিন্তু তাঁকে হাসপাতালে পাঠালেই এ নিয়ে লেখা হয়। কী অসুখ জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাঁর কোন রোগ নেই, বলেন? তিনি কত দিন হাসপাতালে কাটিয়েছেন জানতে চাইলে বিপ্লব কান্তি বলেন, ২০১৩ সালে কারাগারে আসার পর প্রায় অর্ধেক সময়ই হাসপাতালে থেকেছেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি ঘোষণা করেছেন। এর মধ্যে আমিন হুদা প্রায় সারা বছরই বিভিন্ন হাসপাতালের বিছানায় জেল খাটেন। এমন একজন আসামির জন্য অস্ট্রেলিয়ার সরকারের এমন দাবি আসলে অযৌক্তিক। মূলত, হাইকমিশন তাদের অসুস্থ এই নাগরিকের সঙ্গে দেখা করে প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তার বিষয়ে কথা বলবে। তাঁকে আবারও হাসপাতালে রাখার পরামর্শ দেবে।

এখন যেসব রোগের কথা বলে হাইকমিশন কনস্যুলার সুবিধা চেয়েছে, সেসব রোগের কথা আগে বলেনি। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ২৬ নভেম্বর সাধারণ বন্দী হিসেবে আমিন হুদা বারডেমে যান। ‘কোমর ব্যথা’ নিয়ে ভর্তি হয়ে টানা ১৮ মাস হাসপাতালের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে আরাম-আয়েশে কাটিয়েছেন। যদিও কারা কর্তৃপক্ষের কাগজপত্রে এই রোগীর ‘বুকে ব্যথা’র কথা বলা হয়েছিল। এরপর নানা সময়ে নানা রোগের কথা বলে এসে হাসপাতালে থেকেছেন। সর্বশেষ গত ৫ মার্চ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ‘পেটে ব্যথা’ নিয়ে ভর্তি হয়ে ভিআইপি কেবিনে ছিলেন। পরে ৩০ মার্চ তাঁকে আবার কারাগারে ফেরত নেওয়া হয়, তা-ও বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর।

কারাগার সূত্রে জানা গেছে, কারাগারে যাওয়ার পর থেকেই আমিন হুদা বিভিন্ন সময়ে অ্যাপোলো, ইব্রাহিম কার্ডিয়াক, ঢাকা মেডিকেল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও বারডেম হাসপাতালে থেকেছেন।

জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান প্রথম আলোকে বলেন, দেশে ইয়াবা ছড়িয়ে পড়ার জন্য অনেকের মতো আমিন হুদাও দায়ী। সে কারণে কেউ বললেই তাঁর বিষয়ে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত দেওয়া যাবে না। তা ছাড়া এই আসামি সাজা পাওয়ার পর বেশির ভাগ সময়ই হাসপাতালে কাটিয়েছেন। এমনিতেই তিনি অনেক বেশি সুযোগ-সুবিধা পেয়েছেন। কনস্যুলার সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে এসব বিবেচনা করা হবে।

যদিও ভিয়েনা কনভেনশন অন কনস্যুলার রিলেশন্সে অনুসমর্থনকারী হিসেবে এর শর্তগুলো পালনে বাংলাদেশ সরকারের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নুরুল হুদা বলেন, ‘একজন ক্রিমিনালের জন্য হাইকমিশনের কেন এত দরদ, বুঝতে পারলাম না। তিনি তো একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামি। তাঁর হয়ে কীভাবে এমন চিঠি দেয়? আর অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশন চিঠি দিলেই সরকারের এই সুবিধা দিতে হবে এমন কোনো আইন নেই। বরং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচিত হাইকমিশনকে চিঠি দেওয়া। কীভাবে তারা এমন আবদার করল।’