নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
০৩ মে ২০১৮, ১৩:৪২ 
আপডেট: ০৩ মে ২০১৮, ১৫:৫৪

  • কেবল আহত পুলিশ পরিদর্শকের ক্ষেত্রে হত্যাচেষ্টার মামলা
  • বাকি ছয়জনের মামলা জামিনযোগ্য ও কম সাজার ধারায়
  • ইতিমধ্যে চার মামলার আসামি জামিনে বেরিয়ে গেছেন

সাম্প্রতিক আলোচিত সড়ক দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে শুধু পুলিশ পরিদর্শক দেলোয়ার হোসেনের ক্ষেত্রে হত্যাচেষ্টার মামলা হয়েছে। বাকি মামলাগুলো দণ্ডবিধির যেসব ধারায় হয়েছে, তাতে ঘটনার মর্মান্তিকতা যথাযথ গুরুত্ব পায়নি, সাজা অপেক্ষাকৃত কম এবং মামলা জামিনযোগ্য। সাত দুর্ঘটনায় হওয়া মামলাগুলোর চারটিতে আসামিরা জামিন পেয়ে গেছেন। এর জন্য মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে পুলিশের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। 
গত এপ্রিল মাসে বাসের চাপায় রাসেল সরকার, রোজিনা আক্তার, খালিদ হোসেন, দেলোয়ার হোসেন, রুনি আক্তার, আয়েশা খাতুন ও রাজীব হোসেন—এই সাতজনের কেউ হাত হারিয়েছেন, কেউ পা, কেউবা গুরুতর আহত হয়েছেন। রাজীব ও রোজিনা চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। 

সর্বশেষ গত ২৮ এপ্রিল রাজধানীর দোলাইরপাড়ে গ্রিন লাইন পরিবহনের বাসের চাপায় পা হারানো রাসেল সরকারের মামলাটি উল্লেখযোগ্য। রাসেলের অভিযোগ, গ্রিন লাইন পরিবহনের বাসের চালক তাঁকে বাসের পাশে ডেকে আনেন এবং একপর্যায়ে চাপা দেন। সে সময় ভেতর থেকে বাসের সুপারভাইজার রাসেলের গায়ের ওপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দেওয়ার জন্য চালককে উসকাচ্ছিলেন। তাঁর কাছে এটা পরিষ্কার, তাঁরা জেনেবুঝে তাঁকে চাপা দিয়েছেন এবং উদ্দেশ্য ছিল তাঁকে হত্যা করা। রাসেল হত্যাচেষ্টার অভিযোগ করলেও মামলা হয়েছে ফৌজদারি কার্যবিধির ২৭৯, ৩৩৮ (ক) ধারায়। বেপরোয়া গাড়ি চালানোর কারণে কারও জীবন বিপন্ন বা আহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে ২৭৯ ধারায় অভিযোগ আনা হয়। এ ধারায় সর্বোচ্চ সাজা তিন বছর কারাদণ্ড কিংবা ১ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডের সুযোগ আছে। ৩৩৮ (ক) ধারায় অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ সাজা সাত বছর কারাদণ্ড। বেপরোয়া বা অবহেলা করে গাড়ি চালিয়ে কারও জীবন বিপন্ন বা আহত করলে এই ধারায় মামলা হয়। দুটি ধারাই জামিনযোগ্য।

রাসেল সরকারের পা বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর তাঁর ভাই আরিফ সরকার বাদী হয়ে ঘটনার দিন যাত্রাবাড়ী থানায় মামলা করেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, পুরো ঘটনা বুঝিয়ে বলার পর পুলিশের সহযোগিতায় তিনি মামলা করেছেন। তিনি বলেন, তাঁর ভাইকে মেরে ফেলার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু পুলিশ তখন বলেছে সরাসরি হত্যাচেষ্টার মামলা করা যায় না। একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সাধারণ কর্মী আরিফ এর আগে কখনো সড়ক দুর্ঘটনার মামলা করেননি। তবে তাঁর আশঙ্কা, মামলার অভিযোগ লেখা হয়েছে দুর্বলভাবে। এতে আসামিরা বেরিয়ে যেতে পারেন। বাসচালক কবির মিয়ার রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের আবেদন মঞ্জুর না হওয়া নিয়েও দুঃখ প্রকাশ করেছেন আরিফ। এখন আদৌ তাঁরা বিচার পাবেন কি না, সে আশঙ্কা জানালেন তিনি। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি আবদুল্লাহ আবু বলেন, ‘পত্রপত্রিকায় যা দেখেছি তাতে মামলাটি ৩০৭ ধারায় (খুনের চেষ্টা) হওয়া উচিত ছিল। এই ধারায় মামলাটি না হলে তা সঠিক হয়নি।’ 

মামলাটির তদন্ত করছেন যাত্রাবাড়ী থানার উপপরিদর্শক সাঈদ হাসান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তাৎক্ষণিকভাবে যে তথ্য পাওয়া গেছে, তার ভিত্তিতেই মামলা দেওয়া হয়েছে। এখন তদন্ত করে যদি দেখা যায় হত্যাচেষ্টা হয়েছে, তাহলে মামলায় নতুন ধারা সংযোজিত হবে। নতুন ধারা যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলেও জানান তিনি। 

রোজিনা আক্তার: গত ২০ এপ্রিল বনানীতে বাসের চাপায় রোজিনা আক্তারের পা হারানোর পর দায়ের হওয়া মামলাও হয়েছে ২৭৯, ৩৩৮ (ক) ধারায়। এই মামলার আসামি শফিকুল ইসলাম জামিন পেয়েছেন ঘটনার পাঁচ দিনের মাথায়। 
খালিদ হোসেন: গত ১৭ এপ্রিল হাত হারানো খালিদ হোসেন হৃদয়ের মামলার আসামিরাও ছাড়া পেয়েছেন। গোপালগঞ্জে আহত হৃদয় একজন পরিবহনশ্রমিক। তাঁর মামলাটিও করা হয়েছে ২৭৯, ৩৩৮ (ক) ধারায়। 
দেলোয়ার হোসেন: একমাত্র ব্যতিক্রম পুলিশ পরিদর্শক দেলোয়ার হোসেনের মামলা। গত ১৬ এপ্রিল পলাশীর মোড়ে দায়িত্ব পালনের সময় ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মীদের বহনকারী একটি বাসের চালকের বচসা হয়। অভিযোগ ওঠে, বাসটির চালক উল্টো পথে যাওয়ার আবদার করেছিলেন। ট্রাফিক পরিদর্শক দেলোয়ার হোসেন আবদার না রাখায় বাসটি তাঁর পায়ের ওপর দিয়ে চালিয়ে দেন বাসচালক নজরুল ইসলাম। এই ঘটনায় শাহবাগ থানায় ২৭৯, ৩৩৮ (ক) ধারার পাশাপাশি জামিন অযোগ্য ৩০৭ ধারায় মামলা হয়েছে। হত্যাচেষ্টার (৩০৭ ধারা) অভিযোগে দায়ের হওয়া এই মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত হলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে আসামির। 
রুনি আক্তার: গত ১১ এপ্রিল নিউ ভিশন বাসের ধাক্কায় রুনি আক্তার আহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মামলার আসামিরও জামিন হয়েছে। এটিও জামিনযোগ্য ২৭৯ ও ৩৩৮ (ক) ধারায় করা। 

আয়েশা খাতুন: গত ৫ এপ্রিল প্রথম শ্রেণি পড়ুয়া মেয়েকে স্কুলে দিতে যাওয়ার পথে নিউমার্কেটের কাছে বিকাশ পরিবহনের দুটি বাসের প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়ে যায় আয়েশা খাতুনদের বহনকারী রিকশাটি। বাস রিকশাসহ তাঁদের টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায় অনেক দূর। শরীরের নিচের অংশ অসাড় হয়ে যাওয়া দুই সন্তানের মা আয়েশা এখনো সিআরপিতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। আয়েশা বাড়ি ফিরতে না পারলেও জামিনে বাড়ি ফিরেছেন বাসচালকসহ দুই আসামি। নিউমার্কেট থানায় দায়ের হওয়া ওই মামলায় আসামি ছিলেন মো. মজহারুল ইসলাম ও শাহ আলম। 

আয়েশা খাতুনের স্বামী তানজির আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই বিষয়টা বিচার বিভাগ, সরকার সবাই জানে। তারপরও আসামি জামিনে বেরিয়ে আসে। এ জন্যই তো বেপরোয়া গাড়ি চালানোও বন্ধ হয় না। পুলিশ তৎপর হলে কি 

জামিনটা হতো? আমি আয়েশাকে দেখব, না মামলার পেছনে ছুটব?’
রাজীব হোসেন: গত ৪ এপ্রিল বাসের চাপায় হাত হারানো রাজীব বাদী হয়ে শাহবাগ থানায় মামলা করেছিলেন। তাঁর মামলাটিও ২৭৯ ও ৩৩৮ (ক) ধারায় দায়ের হয়েছিল। তবে রাজীব চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়ার পর নতুন করে ৩০৪ (খ) ধারা যুক্ত করা হয়েছে। খুন নয়, অপরাধজনক প্রাণহানির অভিযোগ আনা হয় এই ধারায়। অপরাধ প্রমাণিত হলে ১৪ বছর পর্যন্ত সাজা, সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড কিংবা জরিমানা বা সব ধরনের দণ্ডের বিধান রয়েছে। 
শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, যেকোনো দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে হত্যাচেষ্টা মামলা দেওয়া যায় না। কেউ মারা গেলে নতুন ধারা সংযোজন করা হয়। রাজীবের ক্ষেত্রে তা–ই হয়েছে। 
আইনজীবীরা মনে করেন, ২৭৯ ও ৩৩৮ (ক) ধারার মামলা জামিনযোগ্য বলেই আসামিরা জামিন পেয়ে যাচ্ছেন। এই ধারা দুটি সম্পূর্ণ জামিন অযোগ্য করা উচিত। যেসব ক্ষেত্রে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ উঠছে, সেখানে হত্যাচেষ্টার মামলাই হওয়া দরকার। 

তবে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মীর রেজাউল আলম মনে করেন, এখনই হতাশ হওয়ার কিছু নেই। থানা অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় মামলার ধারা দিয়ে থাকে। সব সময়ই ধারা সংযোজনের সুযোগ থাকে। 

ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি আছে, বাস্তবায়ন নেই
বিআরটিসি ও স্বজন পরিবহনের বাসের চাপায় রাজীব হোসেন হাত হারানোর এক দিন পর হাইকোর্টে রিট করেন আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস। বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী ও বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হক বিআরটিসি ও স্বজন পরিবহনকে চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহের নির্দেশ দেন। রাজীবের খালা জাহানারা খাতুন প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজে এসে বিআরটিসির কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে ২০ হাজার এবং স্বজন পরিবহনের পরিচয় দিয়ে কয়েকজন লোক এসে ২০ হাজার টাকা দিয়ে গেছেন। 

আয়েশা খাতুনের স্বামী তানজির আহমেদ এখন পর্যন্ত কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি। হাইকোর্ট বিকাশ পরিবহনের খরচে রোগীকে প্রয়োজনে বিদেশে পাঠানোর নির্দেশও দিয়েছিলেন। কোনোটাই হয়নি। 
পা হারানো রাসেলের চিকিৎসা ব্যয় বহন করছে তাঁর প্রতিষ্ঠান। গ্রিন লাইন পরিবহন কোনো খোঁজখবরও করেনি। 

সড়ক দুর্ঘটনায় চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ও সাংবাদিকতার শিক্ষক মিশুক মুনীর নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাটি লড়েছিলেন আইনজীবী সারা হোসেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনাগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে না। উচ্চ আদালত যখন অসাধারণ কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন, তখন প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু এমন একটা ব্যবস্থা থাকা দরকার যাতে ভুক্তভোগীরা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় নিয়মিত প্রতিকার পান। তিনি আরও বলেন, ‘ঘটনাগুলো মনোযোগ দিয়ে কেউ দেখছে না। আইনের সংশোধনের বিষয়টি সাত বছর ধরে ঝুলে আছে। ক্ষতিপূরণের মানদণ্ড, জবাবদিহি, সুরক্ষার বিষয়গুলো সুনির্দিষ্ট হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু হচ্ছে না।’