রোজিনা ইসলাম, ঢাকা২০ মার্চ ২০১৮, ১১:১৯ 
আপডেট: ২০ মার্চ ২০১৮, ১২:০৬

• জালিয়াতি প্রকাশের পর তদন্ত ও বিচারের দাবি ওঠে। 
• ঘটনা তদন্ত করে মন্ত্রণালয়ের দুটি কমিটি ও সংসদীয় কমিটি। 
• অনুসন্ধানের দায়িত্ব নেয় দুদক। 
• মামলা করা হয় মন্ত্রণালয় থেকে। 
• সবই থমকে আছে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখার জন্য বিদেশি বন্ধু ও সংগঠনকে দেওয়া ক্রেস্টে সোনা জালিয়াতির ঘটনায় চার বছরেও বিচারের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারেনি সরকার। বরং ক্রেস্টে সোনা কম দেওয়ার ঘটনায় করা মামলায় মাত্র ১০ হাজার টাকা মুচলেকা দিয়ে ক্রেস্ট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের দুজন জামিন নিয়েছেন। তদন্তের পর তদন্ত চললেও সবগুলোর প্রতিবেদনই এক প্রকার হিমঘরে পড়ে আছে। কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

জালিয়াতির ঘটনা প্রকাশিত হওয়ার পর সব মহল থেকে এ ঘটনার তদন্ত ও বিচারের দাবি ওঠে। ঘটনাটি তদন্ত করে মন্ত্রণালয়ের দুটি কমিটি এবং সংসদীয় কমিটি। অনুসন্ধানের দায়িত্ব নেয় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলা করা হয় মন্ত্রণালয় থেকে। কিন্তু সবই থমকে আছে।একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির প্রথম আলোকে বলেন, এ কেলেঙ্কারির সবকিছু দৃশ্যমান। তাই এ ঘটনায় দোষী ব্যক্তিদের সাজা পাওয়া উচিত। তদন্ত প্রতিবেদনও প্রকাশ করা উচিত।

২০১৪ সালের ৬ এপ্রিল প্রথম আলোয় ‘ক্রেস্টের স্বর্ণের ১২ আনাই মিছে!’ শিরোনামে খবর প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখার জন্য বিদেশি বন্ধু ও সংগঠনকে দেওয়া স্বর্ণের ক্রেস্ট পরীক্ষা করে দেখা গেছে, তাতে এক ভরি বা ১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রাম সোনা থাকার কথা থাকলেও সোনা পাওয়া গেছে মাত্র ২ দশমিক ৩৬৩ গ্রাম (সোয়া তিন আনা)। আর রুপার জায়গায় ৩০ ভরি বা ৩৫১ গ্রাম পিতল, তামা ও দস্তামিশ্রিত সংকর ধাতু দেওয়া হয়েছে ক্রেস্টে।

এই কেলেঙ্কারি ফাঁস হলে প্রথমে বিভাগীয় কমিশনার পর্যায়ের কর্মকর্তাকে দিয়ে তদন্ত করানো হয়। তদন্ত কমিটি সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এ বি তাজুল ইসলাম, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব কে এইচ মাসুদ সিদ্দিকীসহ ১৩ জন কর্মকর্তা এবং দুটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করে প্রতিবেদন দেয়। তবে বিভাগীয় কমিশনার পর্যায়ের কর্মকর্তাকে দিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অভিযোগের তদন্ত করানো নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অভিযুক্ত প্রতিমন্ত্রী ও সচিবেরা।

পরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তৎকালীন বাণিজ্য ও অর্থসচিব হেদায়েতুল্লাহ আল-মামুনকে প্রধান করে আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করে ২০১৪ সালের ২ আগস্ট। ওই কমিটি প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে জমা দেওয়ার প্রস্তুতি নিলে তাও স্থগিত করে দেওয়া হয়। সম্প্রতি হেদায়েতুল্লাহ আল-মামুন অবসরোত্তর ছুটিতে (পিআরএল) চলে গেছেন। দীর্ঘ দুই বছর তদন্ত করার পর এই কমিটির এখতিয়ার নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যরা এই কমিটির প্রধানকে জানান, তাঁরা এই বিষয়টির তদন্ত করেছেন, তাই আর কারও তদন্ত প্রতিবেদন গ্রহণযোগ্য হবে না। তাঁদের দাবি, জনপ্রতিনিধিদের দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদন প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাদের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ওপর প্রাধান্য পাবে। তাই অধিকতর তদন্তের প্রয়োজন নেই।

তদন্তে স্বার্থের সংঘাত
সংসদীয় কমিটির পক্ষ থেকে যে তদন্ত করা হয়েছে, তাতে স্বার্থের সংঘাত (কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট) ঘটেছে বলে অভিযোগ আছে। কেননা সংসদীয় কমিটির প্রধান এ বি তাজুল ইসলাম এ তদন্তের নির্দেশ দেন। অথচ কেলেঙ্কারির ঘটনার সময় তিনিই ছিলেন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী। মন্ত্রণালয়ের তদন্তে তাঁকেও দায়ী করা হয়েছিল। সংসদীয় উপকমিটির পক্ষ থেকে এক বছর তদন্ত করার পর যে প্রতিবেদন দেওয়া হয়, সেখানে তাজুল ইসলামের নাম নেই। প্রতিবেদনে ক্রেস্ট তৈরির বিষয়ে অবহেলা ও অনিয়ম এবং ক্রেস্ট পরীক্ষার প্রতিবেদন গোপন করায় মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব কে এইচ মাসুদ সিদ্দিকী, যুগ্ম সচিব আবুল কাসেম তালুকদার, উপসচিব এনামুল কবির ও শাখা সহকারী আবুল কাসেমকে (ভারপ্রাপ্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তা) দায়ী করা হয় এবং তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘ক্রেস্ট নিয়ে ন্যক্কারজনক জালিয়াতির বিচার না হওয়া সরকারের জন্য বিব্রতকর বলে আমরা মনে করি। অনেক দিন পার হয়েছে, সরকারের উচিত এ বিষয়ে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনা। যেখানে সংসদীয় কমিটির প্রধানই অভিযুক্ত ব্যক্তি, সেখানে সংসদীয় তদন্ত কমিটি তাঁকে কতটা দায়ী করতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।’

এদিকে অধিকতর তদন্তের জন্য গঠিত কমিটির প্রধান ও সাবেক অর্থসচিব হেদায়েতুল্লাহ আল-মামুন প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের আধা সরকারি পত্র দিয়ে জানিয়ে দিয়েছিলেন প্রতিবেদন তৈরি। কিন্তু এর জবাবে তাঁদের আর কিছুই জানানো হয়নি।

জামিন পেয়েছেন ঠিকাদারেরা
ক্রেস্ট জালিয়াতির ঘটনায় সরবরাহকারী দুটি প্রতিষ্ঠানের মালিকের বিরুদ্ধে ২০১৪ সালের ১০ জুন প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মামলা করেছিল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। রাজধানীর বনানীতে অবস্থিত ক্রেস্ট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এমিকনের মালিক মীর দাউদ আহমেদ ওরফে নাজিম এবং শান্তিনগরের মেসার্স মহসিনুল হাসানের স্বত্বাধিকারী মো. মোহসিনুল হাসান। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, দুজনই আদালতে আত্মসমর্পণ করে আগাম জামিন নিয়েছেন। শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) জাফর আলী বলেন, সেই কবেকার কথা। সবাই ভুলে গেছে।

এগোয়নি দুদকের অনুসন্ধানও
২০১৪ সালের ২ জুন ঘটনা অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। শুরুতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদন সংগ্রহ করা হয়েছে, নথিপত্র জব্দ করেছে। প্রথমে দুদকের উপপরিচালক মির্জা জাহিদুল আলমকে অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে দায়িত্ব পান উপপরিচালক শেখ আবদুস ছালাম। তিনি চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার পর আর বিষয়টি এগোয়নি।

জালিয়াতির ঘটনাটি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের। তাই তাদের দায়িত্বই বেশি। কী করেছেন তাঁরা? এ বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছি। শাহবাগ থানায় মামলা করেছি। কিন্তু আমাদের কাছে কেউ কিছু জানতে চায়নি।’ তাঁর মতে, দুদকের উচিত বিষয়টি ভালো করে তদন্ত করা।