৩২ ধারায় বলা হয়েছে, ‘‘যদি কোনও ব্যক্তি বে-আইনি প্রবেশের মাধ্যমে কোনও সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ কোনও সংস্থার কোনও ধরনের অতি গোপনীয় বা গোপনীয় তথ্য-উপাত্ত, কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনও ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমে ধারণ, প্রেরণ বা সংরক্ষণ করেন বা করতে সহায়তা করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে কম্পিউটার বা ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ৷”

আর এই অপরাধের শাস্তি হতে পারে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ড এবং ২৫ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড৷ একাধিকবার কেউ এই অপরাধ করলে তার শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড৷

এই ধারাটি আইনে পরিণত হলে বাংলাদেশে সবচেয়ে চাপের মুখে পড়বে সাংবাদিকতা, বিশেষ করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা৷ আর তাই এই আইনের প্রতিবাদে বাংলাদেশের সাংবাদিকরা ‘আমি গুপ্তচর’ নামে একটি হ্যাশট্যাগ ক্যাম্পেইনও শুরু করেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে৷

এই আইনটি’র বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ সম্পাদক পরিষদ৷গত ৬ ফেব্রুয়ারি সম্পাদক পরিষদ এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইনের হয়রানিমূলক ৫৭ ধারা বাতিল করে ওই ধারার বিতর্কিত বিষয়গুলো প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে রেখে দেওয়া এবং এর পাশাপাশি আরও নতুন কয়েকটি কঠোর ধারা সংযোজন করায় আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন্৷ আমরা অবিলম্বে ৫৭ ধারাসহ আইসিটি আইনের বিতর্কিত সব ধারা বাতিল এবং প্রস্তাবিত নতুন আইনে যুক্ত ৩২ ধারাসহ বিতর্কিত ধারাসমূহ খসড়া থেকে বাদ দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি৷”

সম্পাদক পরিষদ মনে করে, ‘‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩২ ধারায় ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তি প্রসঙ্গে অপরাধের ধরন ও শাস্তির যে বিধান রাখা হয়েছে, তা গণতন্ত্রের মৌলিক চেতনা এবং বাকস্বাধীনতায় আঘাত করবে৷ একই সঙ্গে তা স্বাধীন সাংবাদিকতাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলার মতো পরিবেশ সৃষ্টি করবে৷ প্রস্তাবিত এ আইনে কেউ কোনো সরকারি সংস্থার গোপনীয় তথ্য কম্পিউটার, ডিজিটাল যন্ত্র ও ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ধারণ করলে তা কম্পিউটার বা ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তি বলে সাব্যস্ত করে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে৷” সম্পাদক পরিষদ আরো মনে করে, ‘‘প্রস্তাবিত এ আইন আরও কঠোর৷ এটি মুক্ত সাংবাদিকতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার পরিসরকেও সংকুচিত করবে৷” তাই তাড়াহুড়ো না করে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি চূড়ান্ত করার দাবি জানায় সম্পাদক পরিষদ৷

আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা বনাম ডিজিটাল আইনের ৩২ ধারা

আইসিটি আইনের ৫৭ ধারায় বলা হয়েছে–

(১ উপ-ধারা): ‘‘কোনো ব্যক্তি যদি ওয়েবসাইটে বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যাহা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেহ পড়িলে, দেখিলে বা শুনিলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হইতে উদ্বুদ্ধ হইতে পারেন অথবা যাহার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করিতে পারে বা এ ধরনের তথ্যাদি কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে প্রদান করা হয়, তাহা হইলে তাহার এই কার্য হইবে একটি অপরাধ৷”

(২): ‘‘কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১)-এর অধীন অপরাধ করিলে তিনি অনধিক চৌদ্দ বছর এবং ন্যূনতম সাত বৎসর কারাদণ্ডে এবং অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন৷”

৫৭ ধারায় মানহানি, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করাসহ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর মতো বিষয়গুলো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা নাই৷ তাই এর অপপ্রয়োগের সুযোগ ছিল এবং অপপ্রয়োগ হয়েছে৷ বিশেষ করে প্রভাবশালীরা এই আইনটি সাংবাদিকদের হয়রানিতে ব্যাপকভাবে ব্যাহার করেছেন৷ সাধারণ মানুষও কম হয়রানির শিকার হননি৷

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ডিজিটাল আইনের ৩২ ধারা আরো অনেক কঠোর৷ এই আইন কার্যকর হলে সাংবাদিকরা যেসব বাধার মুখে পড়তে পারেন তা হলো:

১. সরকারি, আধা সরকারি, ,স্বায়ত্তশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ কোনও সংস্থায় গিয়ে সাংবাদিকরা ঘুষ-দুর্নীতির অনুসন্ধান করতে পারবেন না৷

২. ঘুস-দুর্নীতির কোনও দালিলিক প্রমাণ সংগ্রহ করতে পারবেন না৷

৩. এসব অবৈধ কাজের কোনও ভিডিও বা অডিও করতে পারবেন না৷

৪. কোনও ডকুমেন্ট, ভিডিও, অডিও সংগ্রহ বা ধারণ করলেও তা প্রকাশ করতে পারবেন না৷

যদি সাংবাদিকরা বৈধ অনুমতি না নিয়ে এসব করেন, তাহলে তারা ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তির দায়ে দায়ী হতে পারেন৷ সাধারণ মানুষও আর ঘুস দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ করতে পারবেন না৷ তাঁরা ঘুস দিতে বাধ্য হলেও, তার কোনো প্রমাণ বা ডকুমেন্ট প্রকাশ করলে এই আইনের শিকার হতে পারেন৷

প্রথম আলোর সিনিয়র রিপোর্টার রোজিনা ইসলাম মনে করেন এতে শুধু সাংবাদিকরা নন, সাংবাদিকদের যাঁরা তথ্য দেন তাঁরাও বিপাকে পড়বেন৷ অনুসন্ধানী সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘শুধু অনুসন্ধানী নয়, প্রতিবেদন তৈরি করতেও সাংবাদিকরা তো সহজে তথ্য পায় না৷ তাকে কোনো-না-কোনোভাবে সোর্সের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করতে হয়৷ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের একটি গোপন তথ্য পুলিশ সদর দপ্তর বা পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়েও পাওয়া যেতে পারে৷ এখন সেই খবর প্রকাশের পর যদি আমাকে সোর্স প্রকাশ করতে হয়, তাহলে আমি তো আর তথ্য পাবো না৷ সাংবাদিকতা কঠিন হয়ে যাবে৷”

তিনি আরো বলেন, ‘‘আর কোনা সঠিক এবং তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন করতে হলে আমাকে তো নানা কৌশলে সঠিক তথ্য নিতেই হবে৷ আর তা করতে গিয়ে যদি আমাকে মামলা ও শাস্তির মুখে পড়তে হয়, তাহলে সাংবাদিকতা তো অনেক কঠিন হয়ে পড়বে৷ যিনি তথ্য দেবেন, তাকেও তো আইনে ধরা হবে৷ তাহলে কেউ তো আর তথ্য দিতে আগ্রহী হবেন না৷”

৩২ ধারা ছাড়াও তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার বিষয়গুলো নতুন ডিজিটাল আইনের খসড়ার ১৯ ধারায় প্রায় একইভাবে রাখা হয়েছে৷ তাতে বলা হয়েছে–

(১) কোনো ব্যক্তি যদি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেক্ট্রনিক বিন্যাসে দণ্ডবিধি ( ১৮৬০ সালের ৪৫ নম্বর আইন)-এর ৪৯৯ ধারা মতে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মানহানি ঘটায়, তাহা হইবে একটি অপরাধ৷

(২) কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইটে বা অন্য কোনও ইলেক্ট্রনিক বিন্যাসে এমন কোনও কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যাহা মিথ্যা বা অশ্লীল এবং যাহা মানুষের মনকে বিকৃত ও দূষিত করে, মর্যাদাহানি ঘটায় বা সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করে, তাহা হইলে ইহা হইবে একটি অপরাধ৷

(৩) কোনও ব্যক্তি যদি স্বেচ্ছায় কোনও ব্যক্তির ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানিবার অভিপ্রায়ে ওয়েবসাইটে বা অন্য কোনও ইলেক্ট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্পচার করেন, যাহা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেহ পাঠ করিলে বা দেখিলে বা শুনিলে তাহার ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করিতে পারে, তাহা হইলে ইহা হইবে একটি অপরাধ৷

তাই বলা চলে নতুন ডিজিটাল আইন তথ্য প্রযুক্তি আইনের চেয়ে আরো কঠোর৷ ডিজিটাল আইনে ৫৭ ধারার বিষয়গুলো তো রাখা হয়েছেই, তার ওপর ৩২ ধারা দিয়ে আরো কন্ঠরোধের পাকা ব্যবস্থা করা হয়েছে৷ অনুসন্ধানকে আইনে ‘ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তি’ বানানো হয়েছে৷

আইনজ্ঞরা যা মনে করেন:

মন্ত্রিসভা ২৯ জানুয়ারি এই আইনটির অনুমোদন দেয়৷ সেদিন মানবাধিকারকর্মী এবং আইনজীবী ব্যরিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া ডয়চে ভেলেকে জানান, ‘‘আইনটির প্রাথমিক খসড়া তৈরির সঙ্গে আমিও যুক্ত ছিলাম৷ কিন্তু আমরা যে প্রস্তাব করেছিলাম তার সঙ্গে মন্ত্রিসভায় অনুমোদন দেয়া আইনের অনেক পার্থক্য৷” তিনি বলেন, ‘‘এ পর্যন্ত যা জানা গেছে তাতে নতুন ডিজিটাল আইনে বিতর্কিত তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা নতুন আইনের ১৮ এবং ১৯ ধারায় ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে৷ শুধু তাই নয়, ৩২ ধরায় যে বিধান রাখা হয়েছে তাতে বাংলাদেশে সাংবাদিকতার ক্ষেত্র এবং স্বাধীনতা আরো সংকুচিত হবে৷”

তিনি বলেন, ‘‘বিনা অনুমতিতে অফিসে ঢুকে কেউ যদি তথ্য নেয়, সেজন্য অন্য আইন আছে৷ কেউ যদি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা ফাইল পাচার করে রাষ্ট্রের ক্ষতি করে, তার জন্য অফিসিয়িাল সিক্রেটস অ্যাক্ট আছে৷ কিন্তু নতুন আইনে আবার তা ঢোকানো হয়েছে৷ কোনো সাংবাদিক স্টিং অপারেশন কেন চালায়৷ ঘুস-দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ করতে৷ এই আইনের ফলে তা আর পারা যাবে না৷ অন্যদিকে সাধারণ মানুষ যদি কোনো সরকারি বা আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ঘুস দিতে বাধ্য হয়, আর তা যদি সে তার মোবাইল ক্যামেরায় ধারণ করে আনে, তা প্রকাশ করতে পারবে না৷ ঘুস খেলেও তার তথ্য প্রকাশ করা যাবে না৷ তাহলে পরিস্থিতি কী দাড়াবে? এটা সুশাসনের পথে বাধা৷ আর সাংবাদিকতা সত্যিই অসুবিধার মুখে পড়বে৷”

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘৩২ ধারায় যেসব অপরাধ, বিশেষ করে গুপ্তচরবৃত্তির বিষয়টি আনা হয়েছে৷ কিন্তু বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে এই অপরাধের আওতা এবং শাস্তির বিধান আছে৷ তাই ডিজিটাল আইনে এটি নিয়ে আসা উদ্দেশ্যপ্রনোদিত৷ এতে দেশের মানুষ হয়রানির শিকার হবে৷ তাদের বাকস্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হবে৷ এই আইনটি কোনো ভালো উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে বলে আমার মনে হয় না৷”

তিনি আরো বলেন, ‘‘এই আইনটি সবচেয়ে চাপের মুখে ফেলবে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে৷ সাংবাদিকরা অনেক দুর্নীতি-অনিয়মের অনুসন্ধান করেন গোপনে এবং অগোচরে৷ অনুমতি নিয়ে তো আর দুর্নীতি-অনিয়মের অনুসন্ধান হয় না৷ ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারিসহ বিশ্বের অনেক দুর্নীতি-অনিয়মের অনুসন্ধান সাংবাদিকরা গোপনেই করেছেন৷ তাই বাংলাদেশে এই আইনটি স্বাধীন সাংবাদিকতাকে যেমন বাধাগ্রস্ত করবে, তেমনি দুর্নীতি-অনিয়কে উৎসাহিত করবে৷” আইনটি পাশের আগে তাই সরকারকে আরো ভালোভাবে তলিয়ে দেখার অনুরোধ জানান আইনের এই অধ্যাপক৷

প্রস্তবিত ডিজিটাল আইনের ৩২ ধারা নিয়ে এরইমধ্যে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সংবাদ মাধ্যমে একাধিবার কথা বলেছেন৷ তিনি দাবি করেছেন, ‘‘দুর্নীতি-অনিয়মের তথ্য প্রকাশে এই আইন কোনো বাধা হবে না৷ সাংবাদিকদের স্বাধীন সাংবাদিকতার ব্যাপারেও বাধা হবে না৷” তবে তিনি এ-ও বলেছেন, এই আইনে কোনো সাংবাদিক মামলা বা হয়রানির মুখে পড়লে তাদের মামলা তিনি বিনা খরচে লড়বেন৷ কিন্তু আইনটি সংশোধন না করে একই অবস্থায় রাখার ব্যাপারে এখনো অবিচল রয়েছে সরকার৷