রোজিনা ইসলাম
১৮ জানুয়ারি ২০১৮, ১২:২২
আপডেট: ১৮ জানুয়ারি ২০১৮, ১২:২৪

নানা রোগের ছুতায় খুনের মামলার আসামি সরকার দলীয় সাংসদ আমানুর রহমান খান চার মাস ধরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শীতাতপ-নিয়ন্ত্রিত কক্ষে থাকছেন। এক রোগ ভালো হলে আরেক রোগের চিকিৎসার কথা বলে হাসপাতালে থেকে সময়ক্ষেপণ করছেন তিনি।

অভিযোগ রয়েছে, সাংসদের সঙ্গে তাঁর স্ত্রী-সন্তান ছাড়াও হাসপাতালে সার্বক্ষণিক সেবা দিচ্ছেন ছাত্রলীগের দুজন নেতা। এই দুই নেতা আবার জেল সুপারের উদারতায় ‘ব্যক্তিগত সেবক’ হিসেবে লিখিত অনুমতি নিয়ে নেতার সঙ্গে থাকছেন। সাংসদের নিয়মিত কাজকর্ম, রাজনীতি —সবই চলছে হাসপাতালে আয়েশি জীবনে।

সাংসদ আমানুর টাঙ্গাইল আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও মুক্তিযোদ্ধা ফারুক আহমেদ হত্যা মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি। এই মামলার অভিযোগপত্র দাখিলের পর ২২ মাস তিনি পলাতক ছিলেন। এরপর গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। তখন থেকে কারাবন্দী। তবে তিনি মূলত হাসপাতালেই থাকেন। টাঙ্গাইলের বিভিন্ন থানায় ৫টি হত্যাসহ ৪৭টি মামলা রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

সাংসদ আমানুর আরাম-আয়েশে হাসপাতালে দিন কাটালেও নিহত ফারুক আহমেদের স্বজনেরা এখন বিচারের আশায় দিন কাটাচ্ছেন। ফারুক আহমেদের স্ত্রী নাহার আহমেদ প্রথম আলোকে জানান, আজ বৃহস্পতিবার তাঁর স্বামীর মৃত্যুবার্ষিকী। পাঁচ বছর হলো তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু এখনো বিচার পাননি। হত্যাকারী নানা বাহানায় হাসপাতালে থাকছেন।

সাংসদের এভাবে হাসপাতালে থাকাকে বিচারপ্রক্রিয়া বিলম্বিত করার কৌশল বলে মনে করেন ফারুক হত্যা মামলায় বাদীপক্ষের আইনজীবী এস আকবর খান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তাঁকে আদালতে হাজির না করার জন্য বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে হাসপাতালে রাখা হচ্ছে।

জানা গেছে, অসুস্থতার অজুহাতে ক্ষমতাসীন দলের এই সাংসদকে আটবার নির্ধারিত তারিখে আদালতে হাজির করা হয়নি। এ জন্য মামলার অভিযোগ গঠন ১০ মাস পিছিয়ে যায়। নবম ধার্য তারিখে আমানুরকে হাজির করে অভিযোগ গঠন হয়। কিন্তু পুনরায় তিনবার সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ চলে গেলেও তাঁকে হাজির করা হয়নি। মামলার পরবর্তী তারিখ ২২ জানুয়ারি।

হাসপাতালের চিকিৎসকেরা বলছেন, আমানুর একেকবার একেক রোগ নিয়ে হাসপাতালে আসছেন। প্রথমে ছিল মূত্রাশয়ের (ইউরোলজিক্যাল) সমস্যা, এরপর ভর্তি হন ফিস্টুলা সমস্যা নিয়ে। এখন দিন কাটাচ্ছেন হৃদ্‌রোগ অসুখের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ছুতায়। প্রভাবশালী রোগী হওয়ায় টানা চার মাস ধরে কেবিন দখল করে ইচ্ছেমতো বসবাস করছেন।

যেভাবে হাসপাতালে থাকেন

গত রোববার সন্ধ্যায় ও সোমবার দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, আমানুরের কেবিনের সামনে নানা রকমের জুতা ও স্যান্ডেলের স্তূপ। ভেতর থেকে দরজা বন্ধ। বাইরে থেকে কথা শোনা যাচ্ছিল। ভেতরে কারা, জানতে চাইলে কেবিনের সামনে দায়িত্বরত পুলিশ কনস্টেবল বলেন, এলাকা থেকে লোক আসছে, ব্যবসায়ীরাও আসে। মাঝে মাঝে বারান্দা ভর্তি হয়ে যায় লোকজনে।

এভাবে কেবিনে ঢোকার নিয়ম আছে কি না, জানতে চাইলে ওই কনস্টেবল বলেন, ‘যে কী বলেন! দল ক্ষমতায়, এই নেতার লোকজনরে কে আটকাবে।’ এ সময় আরেক কনস্টেবল বলেন, ‘তাঁর পরিবারের সব তো তাঁর কাছে আসবেই। ভিআইপি লোক, আত্মীয়স্বজন খাবার নিয়ে আসেন। হাসপাতালের খাবার তিনি খান না। আর স্ত্রী-সন্তান তাঁর সঙ্গেই থাকেন।’

রোববার সন্ধ্যায় কয়েক ব্যক্তি ওই কেবিন থেকে বের হয়ে আসার পর পরিচয় জানতে চাইলে তাঁরা এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমরা দলের লোক।’

সোমবার দুপুরেও হাসপাতালের তৃতীয় তলায় সাংসদের কেবিনের সামনে গিয়েও একই চিত্র দেখা যায়। কেবিনের আশপাশে দায়িত্বরত ছিলেন দুজন পুলিশ সদস্য ও একজন কারারক্ষী। ভেতর থেকে কক্ষের দরজা খোলা হলে দেখা যায়, সাংসদ খাটে বসে আছেন।

কারারক্ষী জানান, প্রতিদিন অন্তত এক শ লোক সাংসদের কাছে আসেন। খুনের মামলার আসামির কক্ষে এত লোককে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে কেন? এ প্রশ্নের জবাবে কারারক্ষী বলেন, ‘ওনার লোক আটকাইলে গ্যাঞ্জাম করে, চাকরি খাওয়ার হুমকি দেয়।’

একপর্যায়ে সাংসদের ব্যক্তিগত সেবক কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসেন। তিনি নিজেকে টাঙ্গাইল ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক শামীম আল মামুন বলে পরিচয় দেন। তিনি বলেন, ‘ভেতরে ঘাটাইলের মামুন চাচাসহ অনেকেই আছেন।’

এভাবে কারাবন্দীর কক্ষে লোকজন ঢুকতে পারেন কি না, জানতে চাইলে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ কারা তত্ত্বাবধায়ক মো. জাহাঙ্গীর কবির গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, কর্তব্যরত কারারক্ষী ও পুলিশের অনুমতি না নিয়ে আসামির কেবিনে ঢুকতে পারার কথা নয়। তিনি খোঁজ নিচ্ছেন, কীভাবে এটা হচ্ছে।

নতুন নতুন অসুখ

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার সূত্র জানায়, প্রথম দফায় গত বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৪৯ নম্বর ভিআইপি কেবিনে ভর্তি করা হয়। সেই সময় টাঙ্গাইল কারা কর্তৃপক্ষ সাংসদ আমানুরের ‘ইউরোলজিক্যাল’ সমস্যা রয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ করে। তখন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ইউরোলজি বিভাগের প্রধান মো. আমানুর রসুল প্রথম আলোকে বলেছিলেন, তাঁর মূত্রনালিতে সমস্যা ছিল। ওষুধ দেওয়ার পর এই সমস্যা এখন আর নেই। এরপর পায়ুপথে সমস্যার কথা জানালে সার্জারি বিভাগে স্থানান্তর করা হয়।

এভাবে হাসপাতালে থাকা নিয়ে সংবাদপত্রে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে গত বছরের ৯ মে আমানুরকে কারাগারে ফেরত নেওয়া হয়। গত ২৪ সেপ্টেম্বর পুনরায় এই আসামিকে ‘উন্নত চিকিৎসার’ জন্য কাশিমপুর কারাগার থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নেওয়া হয়। ওই দিনই তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৪০ নম্বর কেবিনে ভর্তি করা হয়।

হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক তপন কুমার সাহা প্রথম আলোকে বলেন, ‘উনি (সাংসদ) পুরো সুস্থ। অন্য রোগী হলে কবে ছুটি দিয়ে দিতাম। পায়ুপথে অপারেশনের পর আমরা কোনো রোগীকেই এক সপ্তাহের বেশি রাখি না।’

হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মকর্তা সূত্রে জানা যায়, আমানুর ২৪ সেপ্টেম্বর ভর্তির পর নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ২১ অক্টোবর অস্ত্রোপচারের জন্য তাঁকে প্রস্তুত করা হয়। কিন্তু সন্তানদের পরীক্ষার কথা বলে এক মাস পিছিয়ে দেন। ২২ নভেম্বর অস্ত্রোপচার হয়। এক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। এরপর ২৬ ডিসেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের কারাধ্যক্ষ মাহাবুবুল ইসলাম চিঠি পাঠিয়ে দ্রুত তাঁর জন্য মেডিকেল বোর্ড গঠন করে চিকিৎসার বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে বলেন। মেডিকেল বোর্ড গঠন করার পর জানানো হয়, তেমন কোনো সমস্যা নেই। শুধু একজন চিকিৎসক বলেছেন, হৃদ্‌রোগের পরীক্ষার জন্য একটি ইটিটি করা দরকার। ওই পরীক্ষায় এক দিন সময় লাগে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার তাঁকে ইটিটি করার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শরীর বেশি রোমশ, এই অজুহাতে ইটিটি করা হয়নি।

ঢাকার কারা উপমহাপরিদর্শক তৌহিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, কারা চিকিৎসকের পরামর্শেই আসামিদের হাসপাতালে পাঠানো হয়। তবে চিকিৎসার পর দ্রুত কারাগারে ফেরত আনার ব্যাপারে নির্দেশনা রয়েছে। বিলম্ব হলে সেই দায় কারা কর্তৃপক্ষের।