রোজিনা ইসলাম
০৮ ডিসেম্বর ২০১৭, ১৩:১৮
আপডেট: ০৮ ডিসেম্বর ২০১৭, ১৩:১৯

পরিবহন ঠিকাদার ও গুদামের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে কৃষকদের জন্য আমদানি করা প্রায় ২০০ কোটি টাকার সার আত্মসাৎ করা হয়েছে। পরিবহন ঠিকাদারদের দাবি, এই সার বাংলাদেশ রসায়ন শিল্প সংস্থার (বিসিআইসি) সান্তাহারের আপৎকালীন বা বাফার গুদামে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। বাস্তবে গুদামে এই সারের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। কৃষকদেরও দেওয়া হয়নি।

বিসিআইসির গঠিত তদন্ত কমিটি এই দুর্নীতির জন্য সান্তাহার গুদামের সাবেক দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ইনচার্জ) নবীর উদ্দিন ও গুদামের হিসাব কর্মকর্তা মাসুদুর রহমানকে দায়ী করেছে। এদিকে সার গুদামে না ঢোকানোর জন্য দায়ী করা হয়েছে ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে। এগুলো হচ্ছে বাল্ক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, নবাব অ্যান্ড কোম্পানি, পোটন ট্রেডার্স, গ্রামসিকো লিমিটেড, সাউথ ডেল্টা শিপিং ও রেক্স মোটরস। এই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটির মালিক নরসিংদী-২ পলাশ নির্বাচনী এলাকার সাংসদ কামরুল আশরাফ খাঁন। বাকিরাও প্রভাবশালী ঠিকাদার।

বিসিআইসির একাধিক সূত্র বলছে, বিসিআইসির ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে প্রভাবশালী একটি চক্র মিলে বহুদিন ধরে সার পরিবহন ও গুদামে পৌঁছে দেওয়ার নামে এসব করে আসছে। ভুয়া ভাউচার বা রসিদ জেনেও তারা পরিবহন ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ করছে। অন্যদিকে টাকার ভাগ পাওয়ায় সার গুদামে না ঢুকলেও তা নিয়ে কেউ মুখ খোলে না।

২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বিভিন্ন সময় সার কেলেঙ্কারির এসব ঘটনা ঘটে। গত ৩১ 
আগস্ট বিসিআইসি চেয়ারম্যানের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। তদন্তে বলা হয়, সার আমদানি, পরিবহন ও গুদামজাত করার তথ্যপ্রমাণ থাকলেও গুদামে সার পাওয়া যায়নি। কাগজপত্র অনুযায়ী, ওই গুদামে ৫৭ হাজার ৯৩৬ দশমিক ৭৫ মেট্রিক টন সার থাকার কথা ছিল।

দেশে কৃষকদের জন্য সার উৎপাদনের পাশাপাশি ঘাটতি পূরণে সার আমদানি করে বিসিআইসি। দেশের ২৫টি আপৎকালীন গুদামে এসব সার সংরক্ষণ করা হয়। আমদানি করা সার গুদাম পর্যন্ত পরিবহন করা হয় বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। সার পরিবহনে নানা অনিয়মের ঘটনা ওই প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে।

বিসিআইসি সূত্র ও তদন্ত কর্মকর্তারা প্রথম আলোকে জানান, পরিবহন ঠিকাদারেরা ট্রাক চালান রসিদ নিয়ে পরিবহন বিল তুলতে বিসিআইসির প্রধান কার্যালয়ে এলে তাঁদের পণ্য প্রাপ্তির রসিদ চাওয়া হয়। তাঁরা এ রসিদ দেখাতে না পারায় সন্দেহ হলে বিসিআইসির পক্ষ থেকে পরিচালক লুৎফর রহমানকে আহ্বায়ক করে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিবহন ঠিকাদারেরা ট্রাক চালান দেখালেও গুদামে কোনো সার ঢোকেইনি। পণ্য প্রাপ্তি স্বীকার-সংক্রান্ত রসিদ (এমআরআর) বইয়ের ৩৫২৪২ হতে ৩৫৩০০ পর্যন্ত উধাও করা হয়েছে।

জানতে চাইলে বিষয়টি স্বীকার করে বিসিআইসির চেয়ারম্যান শাহ আমিনুল হক প্রথম আলোকে বলেন, কোটি কোটি টাকার সার ঠিকাদার আর কর্মকর্তারা মিলে গায়েব করে দিয়েছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনও বিষয়টি তদন্ত করছে। তদন্তের পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনা হবে।

 তদন্ত প্রতিবেদনে সার লোপাট হওয়ার ঘটনায় গুদামের তৎকালীন ইনচার্জ নবীর উদ্দিন খান ও হিসাব কর্মকর্তা মাসুদুর রহমানকে দায়ী করে বলেছে, তাঁদের সাক্ষর ও বক্তব্যে গরমিল রয়েছে। অন্যদিকে ঠিকাদারদের কাছে থাকা চালান রসিদে সাবেক বাফার ইনচার্জ উপপ্রধান প্রকৌশলী নবীর উদ্দিনের স্বাক্ষর পাওয়া গেছে। যদিও দুজন বলেছেন, ওই স্বাক্ষর তাঁদের নয়।

তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সার গুদামে ঢোকানো নিয়ে কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের কথায় মিল পাওয়া যায়নি। তাঁরা একেক সময় একেক কথা বলেছেন। ২০১৬ সালের মার্চ মাস থেকে সাউথ ডেল্টা শিপিংয়ের কাছ থেকে সারের চালান গ্রহণ করার সময় এই গুদামের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ইনচার্জ) ছিলেন নবীর উদ্দিন খান। এরপর গত বছরের এপ্রিলে তিনি অবসরে চলে যান। যাওয়ার সময় ওই গুদামের হিসাব কর্মকর্তা মাসুদুর রহমানকে কাগজপত্র বুঝিয়ে দেন। কিন্তু অনিয়ম আবিষ্কৃত হওয়ার পর তদন্ত কমিটি মাঠে নামলে মাসুদুর রহমান কমিটিকে বলেন, নবীর উদ্দিন খান এই সার আত্মসাৎ করেছেন। অন্যদিকে পণ্য প্রাপ্তির রসিদ ছাড়া পরিবহন বিল পরিশোধ করার কথা না থাকলেও বিসিআইসির প্রধান কার্যালয় ট্রাক চালান দেখেই ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ করে দিয়েছে। এসব বিল পরিশোধ করেন উপব্যবস্থাপক (বাণিজ্যিক) রেজাউল করিম। তদন্ত কমিটিকে তিনি বলেন, কাগজপত্রের গরমিল তাঁর নজরে আসেনি।

তদন্ত কমিটির মতে, গুদামে বাল্ক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল ৩ হাজার মেট্রিক টন সার ঢুকিয়েছিল। এর মধ্যে ১ হাজার ৫০৬ মেট্রিক টন রসিদে নবীর উদ্দিন খান ও মাসুদুর রহমানের স্বাক্ষর রয়েছে। যদিও গুদামের গ্রহণ রেজিস্টারে তা লিপিবদ্ধ নেই এবং ওই সার গুদামে ঢোকেনি। ওই প্রতিষ্ঠানের আরেক চালানের ৫ হাজার ২৪ মেট্রিক টন সার গুদামে পাওয়া যায়নি।

সাউথ ডেল্টা শিপিং অ্যান্ড ট্রেডিং লিমিটেডের সাড়ে ৪ হাজার মেট্রিক টন সারের মধ্যে ৩ হাজার ৮৮৯ মেট্রিক টন সার গ্রহণের বিষয় রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ নেই এবং তা গুদামেও নেই। একইভাবে গ্রামসিকোর ৬১২ দশমিক ৫০ মেট্রিক টন, পোটন ট্রেডার্সের ১১ হাজার ৫০ দশমিক ৭৪ মেট্রিক টন, নবাব অ্যান্ড কোম্পানির ২ হাজার মেট্রিক টন এবং রেক্স মোটরসের ২ হাজার ৮৩৩ মেট্রিক টন সারও গুদামে পাওয়া যায়নি।

এদিকে, ঠিকাদারদের বিষয়ে অভিযোগ তুলে বিসিআইসির পরিচালক (বাণিজ্যিক) আবদুল হাই প্রথম আলোকে বলেন, সান্তাহার গুদামের দুই কর্মকর্তার সঙ্গে ঠিকাদারদের যোগসাজশ রয়েছে। তবে এই কর্মকর্তা প্রথম আলোর কাছে ঠিকাদারদের পরিবহন বিল পরিশোধ করা হয়নি জানালেও তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঠিকাদারেরা বেশির ভাগই বিলই তুলে নিয়ে গেছেন।

এ বিষয়ে সার পরিবহনকারী ঠিকাদার সাউথ ডেল্টা শিপিং অ্যান্ড ট্রেডিংয়ের নির্বাহী কর্মকর্তা মশিউর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের বিরুদ্ধে যা বলা হচ্ছে তা মনগড়া। আমরা সার কর্মকর্তাদের বুঝিয়ে দিয়েছি। বিলও পেয়েছি।’

সার পরিবহনকারী ঠিকাদার ও নরসিংদী-২ পলাশ নির্বাচনী এলাকার সাংসদ কামরুল আশরাফ খাঁনের কাছে জানতে চাইলে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘আমরা যে সার গুদামে ঢুকিয়েছি, তার প্রমাণ আমাদের কাছে। গুদামের ভেতরে কী হয়েছে, তার দায়দায়িত্ব আমাদের নয়।’

তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক বিসিআইসির পরিচালক লুৎফর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা তদন্ত করে দেখেছি, ৫৭ হাজার ৯৩৬ দশমিক ৭৫ মেট্রিক টন সার গুদামে ঢোকেনি। ঠিকাদারেরা কী পরিমাণ সার ঢোকায়নি, তা-ও আমরা স্পষ্ট করে দিয়েছি। দায়ী কর্মকর্তারা সারাক্ষণ বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছে।’

মাসুদুর রহমানের টেলিফোন নম্বরে যোগাযোগ করা হলে তাঁর স্ত্রী প্রথম আলোকে বলেন, মাসুদুর রহমান কথা বলতে আগ্রহী নন। নবীর উদ্দিন খানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে তাঁকে পাওয়া যায়নি। জানা গেছে, তিনি পলাতক রয়েছেন। তবে নবীর উদ্দিন তদন্ত কমিটিকে বলেছেন, বিসিআইসির বিপণন বিভাগের সহযোগিতায় দুর্নীতি করা হয়েছে।