রোহিঙ্গা সংকট সর্বশেষ রোহিঙ্গা এসেছে ৪ লাখ ৯ হাজার—আইএসসিজি শিশু ২ লাখ ৪০ হাজার ১ বছরের কম বয়সী শিশু ৩৬ হাজার গর্ভবতী ও স্তন্যদায়ী নারী ৫২ হাজার ৭৭ মিলিয়ন ডলার জরুরি সহায়তা চেয়েছে জাতিসংঘ মিয়ানমার থেকে প্রাণভয়ে বহু কষ্টে পালিয়ে আসা এক বৃদ্ধা ক্লান্ত–শ্রান্ত হয়ে বসে পড়েছেন রাস্তার ওপর। উখিয়ার বালুখালী এলাকা থেকে গতকাল তোলা ছবি l ছবি: আশরাফুল আলম মিয়ানমার থেকে প্রাণভয়ে বহু কষ্টে পালিয়ে আসা এক বৃদ্ধা ক্লান্ত–শ্রান্ত হয়ে বসে পড়েছেন রাস্তার ওপর। উখিয়ার বালুখালী এলাকা থেকে গতকাল তোলা ছবি l ছবি: আশরাফুল আলম
মিজানুর রহমান খান ও রোজিনা ইসলাম
১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১৭:০৩
আপডেট: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ২১:৫৯

রোহিঙ্গা সংকট

সর্বশেষ

  •  রোহিঙ্গা এসেছে ৪ লাখ ৯ হাজার—আইএসসিজি
  •  শিশু ২ লাখ ৪০ হাজার
  •  ১ বছরের কম বয়সী শিশু ৩৬ হাজার
  • গর্ভবতী ও স্তন্যদায়ী নারী ৫২ হাজার
  • ৭৭ মিলিয়ন ডলার জরুরি সহায়তা চেয়েছে জাতিসংঘ

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জাতিগত সহিংসতার জের ধরে রোহিঙ্গারা যে এভাবে বাঁধভাঙা স্রোতের মতো ধেয়ে আসতে পারে, সে বিষয়ে কোনো গোয়েন্দা তথ্য ছিল না। তাই প্রশাসনের কোনো পর্যায়েই কোনো ধরনের আগাম সতর্কতা বা পূর্বপ্রস্তুতি ছিল না।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমসহ সরকারের উচ্চপদস্থ কয়েকজন কর্মকর্তা প্রথম আলোর প্রশ্নের জবাবে এই গোয়েন্দা ব্যর্থতার কথা স্বীকার করেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কেউ কেউ বলছেন, এটা যে একেবারেই ছিল না, সেটা জাতীয় নিরাপত্তাগত দৃষ্টিকোণ থেকে উদ্বেগজনক অস্বাভাবিক ঘটনা।

জানতে চাইলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত বছরের অক্টোবর পর্যন্ত আমাদের কিছুটা ধারণা ছিল, কিন্তু এরপর এ ধরনের কোনো পূর্বাভাস ছিল না। আমাদের কনস্যুলেট (রাখাইনের সিটিউতে অবস্থিত) সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখেছে। পুরো ঘটনা ঘটেছে হঠাৎ করে। আমাদের কাছে কোনো ধরনের গোয়েন্দা তথ্য ছিল না।’

২০১২ সালের ১২ জুলাই তৎকালীন মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘জাতিগত সংঘাত বন্ধের একমাত্র উপায় হলো রোহিঙ্গাদের অন্য দেশে বহিষ্কার করা।’ নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা এখন বলছেন, বাংলাদেশি নীতিনির্ধারকেরা কল্পনাও করতে পারেননি যে মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে তারা তাদের প্রকাশ্য ঘোষণা এভাবে বাস্তবে রূপ দেবে। গত ১৩ মার্চ মিয়ানমারের মানবাধিকারবিষয়ক জাতিসংঘের স্পেশাল র‍্যাপোর্টিয়ার ইয়াংগি লি জেনেভায় হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলে তাঁর আশঙ্কা ব্যক্ত করে বলেন, মিয়ানমার সব রোহিঙ্গাকে বহিষ্কারের পরিকল্পনা আঁটছে।

কিন্তু এরপরও বাংলাদেশ নির্দিষ্টভাবে ওই আশঙ্কাকে বাস্তব বিবেচনায় চীন, ভারত ও রাশিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো সক্রিয় বা উদ্বেগতাড়িত কূটনীতি চালিয়েছে বলে জানা যায় না; বরং একটি সূত্র বলেছে, ২০১৫ সালে উভয় পক্ষে চুক্তি হয় যে মিয়ানমার বা বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের কেউ ‘রোহিঙ্গা’ বা ‘বাঙালি’ বলবে না। তারা বলবে রাখাইনের সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়। এখন বিশ্লেষকেরা প্রশ্ন তুলছেন, এই তথ্য ঠিক হলে সেটা সুচিন্তিত ছিল কি না। কারণ, এটা মিয়ানমারের অশুভ উদ্দেশ্য পূরণে সহায়ক হয়েছে। তারা এর আগে জাতিসংঘে রোহিঙ্গাদের পরিচয় বাঙালি বলেছিল। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ১৯৭৮-১৯৭৯ বা ১৯৯১-১৯৯২ সালে মিয়ানমারকে এভাবে ধারাবাহিক ও বেপরোয়া কূটনীতি চালাতে দেখা যায়নি।

উল্লেখ্য, ওই সমঝোতার ভিত্তিতে আনান কমিশনের রিপোর্টেও রোহিঙ্গা শব্দটি পরিহার করা হয়েছে। কিন্তু মিয়ানমার সমঝোতার শর্ত লঙ্ঘন করেছে। গত ২৫ আগস্টের হামলার দায়িত্ব কথিতমতে আরাকান স্যালভেশন আর্মি (আরসা) স্বীকার করে নিলেও মিয়ানমার সরকারিভাবে হামলাকারীদের পরিচয় দিতে বাঙালি কথাটি ব্যবহার করছে।

অবশ্য একজন সরকারি কর্মকর্তা গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও মিডিয়া এটি ব্যবহার করছে। অং সান সু চির দপ্তর এটি ব্যবহার করছে না। কিন্তু পশ্চিমা মিডিয়া বলেছে, ওই হামলার পরপরই সু চির দপ্তরের তরফে প্রকাশিত বিবৃতিতে সন্ত্রাসীদের বাঙালি বলা হয়েছে। ২৫ আগস্টের পরপরই চীন, ভারত ও রাশিয়ার তরফে যে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়, তাতে দেখা যায়, তারা বাংলাদেশের সংবেদনশীলতা বিবেচনায় নেয়নি। কারণ, তারা যথাযথভাবে অবহিত ছিল বলে মনে হয় না।

কিছু গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি ঘেঁটে দেখা যায়, গত ১৪ মে অনুষ্ঠিত রোহিঙ্গাবিষয়ক ন্যাশনাল টাস্কফোর্সের ১৩তম বৈঠকের কার্যবিবরণী মতে এ বিষয়ে ‘তুমুল কূটনৈতিক প্রচেষ্টা’ শুধু প্রত্যাবাসন বিষয়ে সীমাবদ্ধ ছিল। পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হকের স্বাক্ষরিত ওই বৈঠকের কার্যবিবরণীতে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে ১৯টি ‘সমন্বিত টহল’ অনুষ্ঠিত হওয়ার উল্লেখ রয়েছে। এর অর্থ দাঁড়ায় এ রকম, পারস্পরিক যোগাযোগের আড়ালে মিয়ানমার তাদের ‘অপারেশন আনফিনিশড বিজনেস’ সফল করার ছক তৈরি করে চলছিল। তবে তৃণমূলে যেমন, তেমনি উচ্চপর্যায়েও আলোচনা চলমান ছিল। সরকারের জাতীয় কৌশলপত্র বলেছে, ২০০৯ সালে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এবং দুই বছর পরে প্রধানমন্ত্রীর মিয়ানমার সফরকালে এবং ২০০৯-১৩ সালে পররাষ্ট্রসচিবদের পাঁচটি কনসালটেশন সভায় ‘প্রত্যাবাসন’ আলোচিত হয়।

তবে এই নথি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছে যে ২০১২ সালে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট থেইন সেইনের সব রোহিঙ্গা বহিষ্কারের ঘোষণা তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। কারণ, ২০১২ সালে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের প্রস্তাবিত ঢাকা সফরের আগেই মিয়ানমারের দেওয়া প্রায় ২ হাজার ৪১৫ জন শরণার্থীর তালিকা থেকে মাত্র ১০টি পরিবারকে ফিরিয়ে নিতে তারা সম্মত হয়। কিন্তু এরপর তারা হঠাৎ বেঁকে বসে। মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের সফরটি মিয়ানমারই স্থগিত করে এবং সেই থেকে এ পর্যন্ত আর নতুন তারিখ ঠিক হয়নি।

এখন জানা গেছে, ১৩ আগস্টের গোড়াতেই রাখাইনে ঘটে যাওয়া সহিংসতা ও সামরিক শক্তি বৃদ্ধির অন্তত দুটি তথ্য বাংলাদেশ সরকারের জানা ছিল। এর একটি হলো, কথিতমতে আরসার হামলায় অন্তত আটজন ম্রোকে হত্যা এবং তার এক সপ্তাহের মধ্যে উত্তর আরাকানে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন। কিন্তু এর জের ধরে ঘটনার আকস্মিকতায় কর্মকর্তারা হকচকিত হয়ে পড়েন।

প্রথম আলোর অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২৫ আগস্টের ঘটনার ৪৮ ঘণ্টা পর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে জরুরি এক বৈঠকে বসেছিলেন বিজেবি, কোস্টগার্ড, পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা। ২৭ আগস্টের ওই সভা ছিল রোহিঙ্গাবিষয়ক অন্যতম সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ন্যাশনাল টাস্কফোর্সের (‘এনটিএফ অন মিয়ানমার রিফিউজিস অ্যান্ড আনডকুমেন্টেড মিয়ানমার ন্যাশনালস (ইউএমএনএস)’ ১৫তম সভা।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অনুমোদন করা এই সভার কার্যবিবরণীতে ইতিহাসের নজিরবিহীন এই রোহিঙ্গা স্রোত সম্পর্কে কেন আগে থেকে কিছুই ধারণা করা সম্ভব হলো না, সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য বা মূল্যায়ন নেই। সভায় ১০টি বিষয়ে সিদ্ধান্ত হলেও এ বিষয়ে কোনো গোয়েন্দা ব্যর্থতা ছিল কি না, সে বিষয়ে কিছু উল্লেখ নেই।

তবে এত বড় একটি বিপর্যয় সম্পর্কে আগে না জানতে পারার কারণ উদ্‌ঘাটন এবং তা নির্মোহভাবে বিশ্লেষণ করা জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। সশস্ত্র সংগঠন আরসার বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ২৫ আগস্ট তাদের হামলা ছিল আত্মরক্ষার্থে। তাদের দাবি, ১০-১১ আগস্ট ৩৩ লাইট ইনফেন্ট্রি ডিভিশন মোতায়েন করা হয়েছিল রাখাইনে।

এদিকে গোয়েন্দা ব্যর্থতা সম্পর্কে জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘যদি বাংলাদেশ সরকারের কাছে এই বিষয়ে আগাম কোনো গোয়েন্দা তথ্য না থাকে, তবে আমি আর্শ্চয হব। কেননা মিয়ানমার যে তাদের রাখবে না, সেটা অনেক দিন ধরেই খোলামেলাভাবে বলে আসছিল। তারা সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। এখন সরকার যদি বলে তাদের আগাম প্রস্তুতি ছিল না, দূতাবাস বা কনস্যুলেট এত বড়মাপে ঘটনা ঘটবে বলে বুঝতে পারেনি, তবে সেটা তাদের সমস্যা।’

কিন্তু ২৭ আগস্ট অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের ওই টাস্কফোর্সের বৈঠকে নিরাপত্তা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো (বিজেবি, কোস্টগার্ড, পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো) সীমান্ত এলাকার পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেছে। তারা বলেছে, আরসা ২ আগস্ট মংগদুতে ছয় থেকে আটজন ম্রো সম্প্রদায়ের লোককে হত্যা করে। এর ফলে রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে শুরু করে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ভারী অস্ত্রশস্ত্র ও হেলিকপ্টার এনে তাদের উপস্থিতি লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি করে।

অন্যদিকে ওই বৈঠকের পরদিনই (২৮ আগস্ট) বিজিবির পরিচালক (পরিকল্পনা) মোহাম্মদ একলিম আবদীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিবকে এক চিঠিতে রাখাইন রাজ্যের উদ্ভূত পরিস্থিতি অবহিত করেন। এতে বলা হয়েছে, সহিংসতার সূত্রপাত ঘটে ১০ আগস্ট মিয়ানমার সরকার কর্তৃক বুথিডং ও রাথিডং এলাকায় অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের মাধ্যমে।

জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব মোস্তফা কামাল উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটা হঠাৎ হয়েছে। সব সময় সব ঘটনা আগে থেকে জানা সম্ভব নয়। গোয়েন্দা তথ্য না থাকা দোষের কিছু নয়। আর রোহিঙ্গাদের এভাবে বাংলাদেশে আসা তো নতুন কিছু নয়, আগেও এসেছে। ধরেন, আমাদের তথ্য ছিল বা তৎপরও ছিলাম। তাতেই বা কী হতো? আমরা কি ওদের গুলি করে মেরে ফেলতে পারতাম, পারতাম না।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সি আর আবরার অবশ্য ওই যুক্তি খণ্ডন করে বলেছেন, ‘বিষয়টি গুলি করে মেরে ফেলার নয়। এটা আগাম জানতে না পারাটার সঙ্গে আমাদের গোয়েন্দা বা নিরাপত্তার দায়িত্বে যাঁরা আছেন, তাঁরা এবং বাংলাদেশ মিশনে যাঁরা আছেন, তাঁদের দক্ষতার একটা প্রশ্ন আছে। আমরা সংকটের প্রকৃত স্বরূপ বুঝতে পারলে বিশ্ব সম্প্রদায়কে আমরা যথাযথ উপায়ে সতর্ক করতাম। আমাদের প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনেতাদের চিঠি লিখতে পারতেন। গোটা বিশ্বে আমাদের রাষ্ট্রদূতগণ এ বিষয়ে সক্রিয় ও সোচ্চার হতে পারতেন। আর তখন এর সবটাই মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের জন্য একটা নিরোধক বিষয় হিসেবে কাজ করত।’

উল্লেখ্য, বান্দরবানের সঙ্গে মিয়ানমারের সব থেকে দীর্ঘ স্থলসীমান্ত। এটা প্রায় ২৭০ কিলোমিটার। জেলা প্রশাসক দিলীপ কুমার বণিক প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওপর থেকে আমাদের কোনোভাবে সতর্ক করা হয়নি। আমরাও বুঝতে পারিনি। এটি একটি আকস্মিক ঘটনা।’

কফি আনান কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশের সঙ্গে আরসার হামলা এবং সেই সূত্রে ব্যাপকভিত্তিক রোহিঙ্গা বিতাড়নের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সে বিষয়ে অনেকেই ইঙ্গিত করেছেন। বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ সংসদে দেওয়া তাঁর বক্তৃতায় বলেন, আনান কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশের কালেই এই বিতাড়নের ঘটনা ঘটল। শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু ইসলামি জুজুর ভয় দেখিয়ে বিতাড়নের বিষয়টি উল্লেখ করেন।

বিজিবির ২৮ আগস্টের এক রিপোর্টে বলা হয়, ১০ আগস্ট শুরু হওয়া সামরিক অপারেশনের মূল লক্ষ্য রাখাইনের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী হলেও তা পরে জাতিগত আক্রোশ বা রোহিঙ্গা নির্মূল বা তাদের বিতাড়নের অপকৌশল হিসেবে প্রতীয়মান হয়।

ওই রিপোর্টে আরও বলা হয়, আনান কমিশনের রিপোর্ট আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের আগেই সেনা মোতায়েন ও অভিযান শুরু করা এবং পরে ২৪ আগস্ট আরসা কর্তৃক ৩০টির মতো নিরাপত্তা বাহিনীর অবস্থান/ক্যাম্প/পোস্টে হামলার ঘটনা সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রাথমিকভাবে অভিযানের সময় সন্দেহভাজন জঙ্গি হিসেবে রোহিঙ্গা পুরুষদের নিয়ে যাওয়া হলেও তা পরে অসহায় নারী ও শিশুর ওপর হামলা, বাড়িঘর পোড়ানো, লুটতরাজ, মসজিদ পোড়ানো ইত্যাদিতে রূপ নেয়।

গোয়েন্দা তথ্য না থাকা বা এত বড় ঘটনা আঁচ করতে না পারা সরকারের ব্যর্থতা কি না, জানতে চাইলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘আরেকটি দেশের ভূখণ্ডে কী হচ্ছে, তা আমাদের জানার কথা নয়। তবে মানবিক সহযোগিতার পাশাপাশি তাদের ফেরত পাঠানোর জন্য আমরা সব ধরনের কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রেখেছি। রোহিঙ্গাদের ফেরত যেতেই হবে, মিয়ানমারকে তাদের ফিরিয়ে নিতে হবে।’ এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘কফি আনান কমিশনের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মনে করেছিলাম, এ সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হবে। কিন্তু দেখা গেল, ওই প্রতিবেদন পাওয়ার ছয় ঘণ্টার মধ্যে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে ঢুকতে শুরু করেছে, যা অত্যন্ত আশ্চর্যজনক।’

প্রথম আলোর অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ২৯ আগস্ট পুলিশের এআইজি মো. মাহবুবুর রহমান ভুঁইয়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ২৮ আগস্ট ইন্টারপোল সূত্রে পাওয়া একটি ই-মেইল বার্তা প্রেরণ করেন। এটি ২৫ আগস্টের হামলা সম্পর্কে মিয়ানমার সরকারের ভাষ্য। মিয়ানমারের সন্ত্রাস দমন সংস্থা এনসিবি নেপিডো (নতুন মিয়ানমারের প্রশাসনিক রাজধানী) ২৮ আগস্ট ইন্টারপোলের কাউন্টার টেররিজম ডিইরেকটরেটকে (আইপিএসজি) পরিস্থিতির হালনাগাদ তথ্য দিয়েছে। কিন্তু তাতে গত ২৭ আগস্ট রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় অনুষ্ঠিত টাস্কফোর্স বৈঠকে দেওয়া আরসার ম্রোং হত্যাকাণ্ডের তথ্যের উল্লেখ নেই। এতে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর এবং ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট উগ্রবাদী বাঙালি সন্ত্রাসীরা নিরাপত্তা পুলিশ সদস্য এবং বর্ডার গার্ড পুলিশ কমান্ড হেডকোয়ার্টার্সে হামলা চালিয়েছে। এ ঘটনায় নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক এই নিরীহ জনগণ হত্যার শিকার হয়। বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র খোয়া যায়। লক্ষণীয় যে এই বার্তার মাধ্যমে মিয়ানমার ইন্টারপোলকে আরসা নিষিদ্ধের কথা জানিয়েছে।

উল্লেখ্য, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ইন্টারপোলকে দেওয়া ওই বার্তায় আগস্টের সহিংসতায় মৃতের কোনো সংখ্যা উল্লেখ করেনি। কিন্তু ২৭ আগস্ট অতিথি ভবন পদ্মার সভায় বলা হয়েছে, ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং রাখাইনের রোহিঙ্গাদের মধ্যে মারাত্মক সংঘাতে ৯০-১০০ জন ‘মিয়ানমারের নাগরিক’ নিহত হন।

তবে আনান কমিশন গত ১৬ মার্চ ৩০টি সুপারিশসংবলিত অন্তর্বর্তীকালীন রিপোর্ট পেশ করে। তারা চূড়ান্ত রিপোর্ট দিয়েছে ২৪ আগস্ট। এই সময়ে রাখাইনের কয়েকটি স্থানে কয়েকটি অদ্ভুত ঘটনার খবর দিয়েছিল আন্তর্জাতিক মিডিয়া। যেমন কফি আনান কমিশন মিয়ানমারে পৌঁছানোর আগের দিন কয়েকটি রোহিঙ্গা-অধ্যুষিত গ্রামের মানুষের চলাচলে বাধা আরোপ করা হয়। এমনকি খাদ্য ও পানি সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছিল উগ্র বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠরা। মিয়ানমারের সরকারি বাহিনী তাদের মদদ দিয়েছিল। এভাবে দেখা যায়, কফি আনান কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশের আগেই বিশেষ পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল।

সরকারি নথিপত্রেও এখন উল্লেখ করা হচ্ছে, ২৫ আগস্টের আরসার কথিত ‘আত্মরক্ষামূলক’ হামলার অনেক আগে থেকেই রাখাইনে ভারী অস্ত্রশস্ত্রসহ সেনা মোতায়েন চলছিল। ২৮ আগস্ট বিজিবির একটি প্রতিবেদন বলেছে, অব্যাহত সহিংসতা এড়াতে ঘুনধুম সীমান্তে পলায়নরত নারী ও শিশুদের ওপর মর্টারের গোলাবর্ষণ চলে। নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের বিপরীতে অবস্থিত গ্রামসমূহে ও বিভিন্ন পাহাড়ে লুকিয়ে থাকা রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের ওপর হেলিকপ্টার গানশিপ থেকেও গোলা নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।

সরকারের জাতীয় কৌশলপত্রও বলেছে, ‘অনুপ্রবেশ রোধের চেষ্টা সত্ত্বেও প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ১০ জন করে রোহিঙ্গা এসেছে।’ বাংলাদেশ কোস্টগার্ড ২৭ আগস্ট স্বরাস্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে যে তারা ১৯ ও ২৩ আগস্ট দুই দফায় ১৫ নারী-শিশুসহ ৪৩ জন রোহিঙ্গাকে পুশব্যাক করেছিল। এমনকি পরিস্থিতি আগের মতো বিবেচনায় তারা ২৬ আগস্টও টেকনাফের নোয়াপাড়া ঝাউবাগান এলাকায় ৫৬ জনকে মিয়ানমারে পুশব্যাক করেছিল। এই ৫৬ জনের মধ্যে ২১ জন নারী ছিলেন, আর শিশু ২৬ জন। পুরুষ ছিলেন মাত্র ৯ জন।

তবে এরপর সব বাধাই খড়কুটোর মতো ভেসে যায়। রোহিঙ্গারা আসতে থাকে বানের পানির মতো। আর বাংলাদেশ নিপতিত হয় সুদূরপ্রসারী নানা জটিলতা ও অনিশ্চয়তার ঘূর্ণাবর্তে।