রোজিনা ইসলাম, খুলনা থেকে ফিরে
২৯ জুলাই ২০১৭, ০২:৩১
আপডেট: ২৯ জুলাই ২০১৭, ০২:৩৩

আধিপত্য বিস্তার ও মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে ‘বেছে বেছে হত্যাকাণ্ড’ (টার্গেট কিলিং) চলছে খুলনায়। অর্থের বিনিময়ে ভাড়াটে খুনিদের দিয়ে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

গত ছয় মাসে নগর ও জেলায় অন্তত ৩১ জনকে এভাবে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনার শিকার হয়েছেন রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে মাদক ব্যবসায়ীরা। চলতি মাসের প্রথম ১১ দিনেই তিনটি খুনের ঘটনা ঘটেছে। নির্বাচনের আগে পরিকল্পিত এসব খুনের ঘটনায় রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরাও আতঙ্কে রয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগ-বিএনপির নেতা, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ শঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, যা শুরু হয়েছে, তাতে মনে হচ্ছে সহিংসতা আরও বাড়বে। বিশেষ করে, সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে ভাড়াটে খুনিরা আরও সক্রিয় হতে পারে।

খুলনা নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাংসদ মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বুঝতে পারছি না কীভাবে এসব শুরু হলো। আমরাও আতঙ্কে আছি। আমি শিগগিরই এসব নিয়ে পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক করব।’

রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গত ২৫ মে রাতে ফুলতলার দামোদর গ্রামে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ঢুকে গুলি করে হত্যা করা হয় জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও ফুলতলা উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান সরদার আলাউদ্দিন ওরফে মিঠুকে। এর আগে একইভাবে তাঁর বাবা সরদার আবুল কাশেম ও বড় ভাই আবু সাঈদ ওরফে বাদলকেও হত্যা করা হয়।

পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আবুল কাশেম হত্যায় ওই এলাকার চরমপন্থী নেতা হিসেবে পরিচিত শিমুল ভূঁইয়া, তাঁর ভাই শিপলু ভূঁইয়া, মোমিনুল ভূঁইয়াসহ ওই পরিবারের আরও কয়েকজনের নামে মামলা হয়। রায়ে এই তিনজনের যাবজ্জীবন সাজা হয়। মামলাটি বর্তমানে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন আছে।

পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ভাড়াটে খুনিদের ৩০ লাখ টাকা দিয়ে আলাউদ্দিনকে খুন করানো হয়েছে। এ ঘটনায় এলাকার এক চরমপন্থী নেতা ও বিএনপির নেতার নাম এসেছে।

আলাউদ্দিনের মেজ ভাই সেলিম সরদার প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের পরিবারের তিনজন এভাবে হত্যার শিকার হয়েছেন। এ ঘটনার পর থেকে তাঁরা বাইরে যেতে ভয় পাচ্ছেন। ইতিমধ্যে মামলা তুলে নিতে হুমকিও দেওয়া হয়েছে।

গত ৩ জুন রাতে দৌলতপুর আঞ্জুমান সড়কে দুর্বৃত্তদের গুলিতে খুন হন ৫ নম্বর ওয়ার্ড ইসলামী আন্দোলনের সভাপতি ইকবাল সরোয়ার। এ সময় এনামুল নামের এক পথচারীও গুলিবিদ্ধ হন। পুলিশ জানায়, ইকবাল সরোয়ার একসময় খুলনার শীর্ষ সন্ত্রাসী টাইগার খোকনের লোক ছিলেন।

এর আগে ১৯৮১ সালে নগরের বাগমারা এলাকায় ৩৫ বছর বয়সে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন ইকবাল সরোয়ারের বড় ভাই শেখ অসিকুর রহমান। পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে জানা গেছে, অসিকুর ওই সময় অগ্রণী যুবদল নামের একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

ইকবাল সরোয়ারের ছোট ভাই শেখ শামীম মুরাদ প্রথম আলোকে বলেন, ১৯৯০ সালের দিকে দৌলতপুর ও পার্শ্ববর্তী দিয়ানা গ্রামের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল। দৌলতপুরের নেতৃত্ব দিতেন আখতারুজ্জামান ওরফে টাইগার খোকন আর দিয়ানা গ্রামের নেতৃত্ব দিতেন গাজী কামরুল। ওই দুই গ্রামের মধ্যে কয়েকবার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষও হয়। তখন ইকবাল টাইগার খোকনের নেতৃত্বে কাজ করতেন। ২০০১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে দুই গ্রামের দ্বন্দ্ব মীমাংসা করা হয়।

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দৌলতপুর দিয়ানা এলাকার গাজী কামরুল ইসলাম ১৯৯০ সালের দিকে বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান ছিলেন। ১৯৯৬ সালে আত্মসমর্পণ করেন। এখন তাঁর বয়স ৬০ বছরের বেশি। ২০১৪ সালে তাঁকে ধরতে গিয়ে পুলিশের উপপরিদর্শক মেহেদী মার খেয়েছিলেন। সে সময় স্থানীয় সাংসদ মন্নুজান সুফিয়ান ওই এসআইকে তাৎক্ষণিক বদলি করান। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে সাংসদ মন্নুজান সুফিয়ানের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।

পুলিশ জানায়, কামরুলের নামে খুলনার বিভিন্ন থানায় নয়টি মামলা রয়েছে। তাঁর ডান হাত ছিলেন শেখ শহীদুল ইসলাম ওরফে ‘হুজি শহীদ’। ২০১৫ সালের ৩০ অক্টোবর এই শহীদ দৌলতপুরের মহসীন মোড় এলাকায় খুন হন। এ ঘটনায় ২০ জনের নামে মামলা করেন তাঁর ভাই তৌহিদুজ্জামান।

নগর পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, যারা বেছে বেছে হত্যা শুরু করেছে, তারা মূলত ভাড়ায় খাটছে। তাদের অনেকে মৌখিকভাবে স্বীকার করেছে, তারা টাকার বিনিময়ে এসব করছে। এসব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে গাজী কামরুলের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে। তিনি বলেন, বিভিন্ন খুনের ঘটনায় আসামিদের মধ্যে গত দুই মাসে ১২ জন পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন। সর্বশেষ ১৭ জুলাই দুই আসামি বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন।

গত ১৪ জুন রাতে রায়ের মহলের হামিদনগর এলাকায় খুন হন মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামী লীগের নেতা শাহাদাত হোসেন মোল্লা। নগর পুলিশের উপকমিশনার (দক্ষিণ) আবদুল্লাহ আরেফ বলেন, জবানবন্দিতে এসেছে, রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারকেকেন্দ্র করে ভাড়াটে খুনি আজম তালুকদার শাহাদাতকে খুন করেছে।

জানতে চাইলে শাহাদাত হোসেন মোল্লার ছেলে আল মামুন প্রথম আলোকে বলেন, আজম তালুকদারের সঙ্গে তাঁর বাবার মাদক নিয়ে দ্বন্দ্ব ছিল।

এর আগে গত ৩১ মে বিলপাবলা এলাকা থেকে এক বৃদ্ধের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তাঁর পরিচয় এখনো পাওয়া যায়নি। ১ জুন নগরের বয়রা ক্রস রোড এলাকায় গলা কেটে হত্যা করা হয় শেখ মোস্তাক আলী (৫৫) নামের এক গ্যারেজ ব্যবসায়ীকে।

খুলনা জেলা পুলিশ সুপার নিজামুল হক মোল্লা প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ এলাকার একটা ইতিহাস আছে, আন্ডারগ্রাউন্ডের পলিটিকসের সঙ্গে রিলেটেড যেসব ব্যক্তি, যাঁরা সুস্থ জীবনে ফেরত এসেছেন, তাঁদের অনেকে তো আর সুস্থ নাই। এটাই মূল কারণ। তাঁরা ফিরে এসে আবার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। যেহেতু গ্রুপিং আছে। আবার আরেকটা ধরন আছে, পারিবারিক আধিপত্য ধরে রাখতে একজনকে শেষ করে দেওয়া।’

একসময় চরমপন্থী দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এমন একজন প্রথম আলোকে বলেন, ব্যক্তিগত আক্রোশ, পারিবারিক কোন্দল এবং এলাকাভিত্তিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই সংঘাত হয়ে থাকে। তিনি বলেন, কিছুদিন ধরে খুলনায় যে খুন হচ্ছে, তাতে ধারালো অস্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে। ধারালো অস্ত্র বহন সহজ এবং খুন করলে শুধু খুনের মামলাই হয়। অস্ত্র দিয়ে খুন করলে মামলা হয় দুটো।

খুলনা সদর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এসব খুন হচ্ছে। ভাড়াটে খুনিদের ও চরমপন্থীদের এসব কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি আনোয়ারুল কাদির মনে করেন, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন যখন বেড়ে যায়, তখনই এসব খুন ও অস্থিরতা বেড়ে যায়। এসবের মূলে রয়েছে অর্থ আর পেশিশক্তি।