হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার এক বছর পার হলেও অনেক প্রশ্নের উত্তর অজানা রয়ে গেছে। ওই ঘটনার তদন্তকাজও শেষ হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে প্রথম আলো মুখোমুখি হয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সোহরাব হাসান ও রোজিনা ইসলাম

প্রথম আলো: জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় আপনি কতটা স্বস্তিতে, যেখানে একের পর এক জঙ্গি আস্তানার হদিস পাওয়া যাচ্ছে?

আসাদুজ্জামান খান: আমরা জঙ্গিদের একদম মূল উৎপাটন করতে পারিনি। তবে যারা শীর্ষস্থানীয় জঙ্গি ছিল, যারা নেতৃত্ব দিয়েছে, যারা সংগঠিত করত, তাদের বেশির ভাগই ধরা পড়েছে। যারা এখন রয়েছে, তাদের মধ্যে মতাদর্শের সমর্থক বা কর্মী কেউ থাকতে পারে, কিন্তু নেতৃত্ব দেওয়ার মতো আপাতত কেউ নেই।

প্রথম আলো: গত বছরের ১ জুলাই হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার ঘটনার নেপথ্যের পাঁচজনকে তো এখনো ধরতে পারেননি?

আসাদুজ্জামান খান: তারা নেপথ্যেই আছে। এখন যারা আটক রয়েছে, অনেকেই অন্য অনেকের নাম বলে। যার কিছুটা অনুমানভিত্তিক মনে হয়। তবে আমাদের কাছে যাদের বিরুদ্ধে তথ্য ছিল, তারা সবাই ধরা পড়েছে শুধু জঙ্গি মেজর(অব.) জিয়াউল হক ছাড়া।

প্রথম আলো: জিয়াউল হক এখন কোথায় আছেন?

আসাদুজ্জামান খান: এ বিষয়টি নিয়ে আমাদের ধূম্রজাল রয়েছে। তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

প্রথম আলো: যদি শীর্ষস্থানীয় সবাইকে ধরে ফেলা হয়ে থাকে, তবে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলা-সংশ্লিষ্ট মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দিতে এত দেরি করছেন কেন?

আসাদুজ্জামান খান: দেখুন, আমরা একটি নির্ভুল প্রতিবেদন দিতে চাই। প্রতিবেদন চূড়ান্ত করার জন্য আমাদের আরও কিছু উপাদান পাওয়া বাকি। এ ঘটনায় ইতালি, জাপান, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরাও মারা গেছেন, আমাদের কর্মকর্তারা মারা গেছেন, সেখানে নির্ভুল অভিযোগপত্র না দিলে অপরাধীদের সাজাও ঠিকমতো হবে না। খুব শিগগির আমরা প্রতিবেদন দেব।

প্রথম আলো: হাসনাত করিম ও তাহমিদ খানের কিছু ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এরপর এই দুজনকে নিয়ে সামাজিক যোগযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে নানা প্রশ্ন উঠেছে।

আসাদুজ্জামান খান: অভিযোগপত্রেই উঠে আসবে কার কী ভূমিকা ছিল।

প্রথম আলো: হোলি আর্টিজান বেকারির এক বছর পূর্তিতে সরকারিভাবে কোনো কর্মসূচি নেওয়া হলো না কেন? যেখানে জাপান, ইতালি থেকে প্রতিনিধি পাঠানো হলো?

আসাদুজ্জামান খান: হোলি আর্টিজান বেকারি কর্তৃপক্ষকে আমরাই শ্রদ্ধা জানানোর জন্য মঞ্চ করতে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেছি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সেখানে শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে শোকসভা, আলোচনা সভা হয়েছে, যেখানে আমাদের সহযোগিতা ছিল।

প্রথম আলো: সাধারণত এ ধরনের বড় বড় বিপর্যয়ে সত্য উদ্‌ঘাটনে ‘কমিশন’ গঠন করা হয়। যেমন ৯/১১-এর হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রে এবং পিলখানা বিদ্রোহের পর বাংলাদশে হয়েছিল। হোলি আর্টিজান বেকারির ঘটনার পর সেটি হলো না কেন?

আসাদুজ্জামান খান: এ রকম দাবি বা অনুরোধও আসেনি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা এ ঘটনায় কারা কারা জড়িত বা অভিযুক্ত ছিল, তা খুঁজে বের করতে সবাই এক হয়ে কাজ করেছি।

প্রথম আলো: ১ জুলাইয়ের ঘটনার বিষয়ে কি অন্য কোনো দেশ আগে থেকে সতর্ক করেছিল বা আপনাদের গোয়েন্দাদের কোনো তথ্য ছিল?

আসাদুজ্জামান খান: আমাদের গোয়েন্দারা আঁচ করছিলেন, বড় কিছু হতে যাচ্ছে। শুধু ধারণা ছিল। কিন্তু কবে করবে, কারা করবে এমন কোনো তথ্য ছিল না। কিন্তু বাইরে থেকে কোনো তথ্য পাইনি। অনেক গোয়েন্দা তথ্যই বাইরে থেকে পাঠানো হয়, যা পরবর্তী সময়ে ঠিক হয় না। তবু কিছু কিছু ঘটনা আমরা আমলে নিই। ধামরাইয়ের মেলা সম্পর্কেও বিদেশি সংস্থা বলেছিল, বড় ধরনের ঘটনা ঘটবে। আমরা এক দিন মেলা বন্ধও রেখেছিলাম। এ রকম কিছু কিছু তথ্যকে আমরা অবশ্যই গুরুত্ব দিই।

প্রথম আলো: জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত আছে, যাকে বলে বলপ্রয়োগ। কিন্তু তাদের প্রতিরোধের জন্য যে সামাজিক বা রাজনৈতিক জাগরণ দরকার, সেখানে তো বড় ধরনের ঘাটতি আছে।

আসাদুজ্জামান খান: জনমত তৈরি করতে আমরা অনেক কাজ করেছি। আমি প্রতিদিন আলেম ও ওলামাদের সঙ্গে বসেছি। এ ছাড়া হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ধর্মের নেতাদের সঙ্গে প্রতিদিন বৈঠক করেছি। জেলায় জেলায়, মাদ্রাসায় মাদ্রাসায় গিয়েছি, মানববন্ধন করেছি। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেছি। বইয়ের সিলেবাসে জঙ্গিবিরোধী বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য কাজও চলছে। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও অধীন দপ্তর বা সংস্থার সঙ্গে বৈঠক করে তাদের কার্যক্রম বাড়াতে বলেছি। দিনের পর দিন মাদ্রাসার শিক্ষকদের নিয়ে বৈঠক করেছি। আমাদের জঙ্গিবিরোধী কমিটিও পুরোদমে কাজ করছে। এসব কারণে মানুষ কিন্তু ঘুরে দাঁড়িয়েছে। মসজিদগুলোতে খুতবা পড়া নিয়ে বিতর্ক হওয়ায় আমরা ইমাম সাহেবদের বলেছি, খুতবার আগে যেন তাঁরা এ বিষয়ে কথা বলেন। তবে এটা ঠিক, যারা এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত, তারা সঠিকভাবে কাজটি করতে পারেনি।

হামলায় িনহত ব্যক্তিদের স্বজনদের আহাজারিহামলায় িনহত ব্যক্তিদের স্বজনদের আহাজারি

প্রথম আলো: এখানে আইএস থাকা না থাকা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। স্বীকার করছেন না কেন আইএস আছে?

আসাদুজ্জামান খান: দেখুন, আইএস হলো একটি আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী বা আদর্শ। সেটা কেন আমাদের এখানে ঢুকিয়ে দেবে? আল-কায়েদার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়েছে, সফল হয়নি। বাংলাদেশে যখনই যে ঘটনা ঘটেছে, পাঁচ মিনিটের মধ্য ছবি আপলোড করা হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে চক্রান্ত করে এ কাজটি করা হয়েছে। ওয়েবসাইট এক হলেই যে আইএস, তা আপনি কীভাবে প্রমাণ করবেন? তাদের মধ্যে ইন্টারনেটে যোগাযোগ থাকতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে আইএসের কোনো অস্তিত্ব নেই। এটা ঠিক, হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত তামিম চৌধুরী বাইরে থেকে বাংলাদেশে এসেছিল। আমরা কানাডাকে বললাম তার ছবি, পাসপোর্টসহ সব তথ্য দাও। আমরা দেখলাম তামিম চৌধুরী নামে বাংলাদেশে একজন বহু আগে ঢুকেছিল। কিন্তু সে বাংলাদেশে এসে আইএস প্রতিষ্ঠা করে গেছে, আমরা তা মনে করি না। এর আগে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত যুক্তরাজ্যের একজন নাগরিকও এসেছিল, যাকে আইএস বলে সন্দেহ করা হয়েছিল। কিন্তু পরে সেও চলে গেছে।

আবার ধর্মভিত্তিক রাজনীতির অনুসারীদের কেউ কেউ প্রকাশ্যে টিকতে না পেরে ‘আন্ডারগ্রাউন্ডে’ চলে যাচ্ছিল। এরা আন্ডারগ্রাউন্ডে গিয়ে বিভিন্ন নামে সংগঠন করছিল। এদের বেশির ভাগ জামায়াতের বা শিবিরের সাবেক নেতা বা কর্মী।

প্রথম আলো: ইতালির নাগরিক সিজার তাবেলা ও জাপানি নাগরিক হোশিও কুনিকে হত্যার পর রাজনৈতিকভাবে বিএনপিকে দায়ী করা হয়েছিল।

আসাদুজ্জামান খান: সিজার তাবেলা হত্যায় বিএনপি নেতা কাইউমের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ আমাদের কাছে আছে। অর্থের জোগান দিয়েছে।

প্রথম আলো: জঙ্গিবাদে অর্থায়ন করছে কারা?

আসাদুজ্জামান খান: সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মাধ্যমে টাকা আসে। এ নিয়ে তদন্ত চলছে। এসব টাকা ব্যাংকিং প্রক্রিয়ায় আসে না, হুন্ডির মাধ্যমে আসে। তাই শনাক্ত করা কঠিন।

প্রথম আলো: জঙ্গি মোকাবিলায় বিষয়ে বিদেশ থেকে কোনো ‘লজিস্টিক সাপোর্ট’ পাচ্ছেন কি না?

আসাদুজ্জামান খান: ওই ধরনের কোনো সহযোগিতা পাচ্ছি না, কিন্তু ‘গোয়েন্দা তথ্য’ দিয়ে সহযোগিতা করছে। কিন্তু নির্দিষ্ট কিছু নয়, ধারণাগত। তবে অনেকেই তদন্ত করতে সহযোগিতা দিতে চাইছে।

প্রথম আলো: জঙ্গিরা একের পর এক জামিন পেয়ে যাচ্ছে, এ বিষয়ে আপনারা কিছু করছেন না?

আসাদুজ্জামান খান: বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। হয়তো সাক্ষী পাওয়া যায় না, হয়তো আমাদের অভিযোগপত্র দিতে দেরি হয়, হয়তো সরকারের পক্ষের আইনজীবীদের দুর্বলতা রয়েছে। আমরা এসব বিষয়ে শিগগিরই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করব। তা ছাড়া বিচার বিভাগ তো স্বাধীন।

প্রথম আলো: অনেকে বলে সরকারের সঙ্গে হেফাজত ইসলামের আঁতাত হয়েছে?

আসাদুজ্জামান খান: দেখুন, আমি দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। জঙ্গি দমনে আমাকে সবাইকে নিয়ে কাজ করতে হবে। হেফাজতের নেতাদের বলেছি, আমরা একটা ন্যূনতম সমঝোতার জায়গায় আসতে পারি। আমরা তাদের বলেছি, বিভাজনে লাভ নেই, আপনারা এক হোন। তাদের ছয়টি বোর্ড আর ১১টি দল ছিল। তারপর তারা এক হয়েছে। এ বিষয়ে আল্লামা শাহ আহমদ শফী ও জুনায়েদ বাবুনগরী একমতও হয়েছেন। তাঁরা জঙ্গিদের বিরুদ্ধে বলেছেন। শাহ আহমদ শফী প্রধানমন্ত্রীর জন্য হাত তুলে দোয়াও করেছেন। আমার তো মনে কাজটি ভালো হয়েছে।

প্রথম আলো: বাংলাদেশ থেকে সিরিয়া গেছে কতজন তরুণ? এ ব্যাপরে কোনো তথ্য আছে? বা সিরিয়া থেকে কেউ এখানে এসেছে?

আসাদুজ্জামান খান: না, বাংলাদেশ থেকে কেউ যায়নি। তবে ব্রিটেন, সিঙ্গাপুর, জাপান থেকে অনেক বাংলাদেশি বা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতরা গেছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। আর সিরিয়া থেকেও এখানে কেউ আসতে পারেনি। তাদের ব্যাপারে কঠোর নির্দেশ রয়েছে।

প্রথম আলো: শোনা যাচ্ছে জঙ্গিবাদে রোহিঙ্গারা জড়িয়ে পড়েছে?

আসাদুজ্জামান খান: আমরা এ বিষয়টি খুব গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। অভাবের তাড়নায় তারা এসব কাজে জড়িয়ে যেতে পারে। তাদের সহজেই প্রলুব্ধ করা যাবে। ইতিমধ্যে তারা নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে।

প্রথম আলো: জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়া যেসব যুবক স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে চান, তাঁদের জন্য আপনারা কী করেছেন?

আসাদুজ্জামান খান: যারা আত্মসর্মপণ করেছে তাদের আমরা আর্থিকসহ বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করছি। একই সঙ্গে তাদের ওপর নজরদারিও থাকবে। এ ছাড়া আমাদের কাছে যে যেভাবে সহযোগিতা চাচ্ছে, আমরা দিচ্ছি। আমরা জঙ্গিদের আহ্বান করেছি, তারা ওই ধ্বংসাত্মক পথ থেকে ফিরে আসুক। আমরা সব ধরনের সহযোগিতা করব।

প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।

আসাদুজ্জামান খান: আপনাদেরও ধন্যবাদ।