সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলা : অভিযোগপত্র দিতে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিতে চায় না পুলিশ

সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলা

অভিযোগপত্র দিতে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিতে চায় না পুলিশ

রোজিনা ইসলাম | আপডেট: ০২:২৯, ফেব্রুয়ারি ০৬, ২০১৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

.সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলার অভিযোগপত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিতে চায় না পুলিশ। অনুমোদন নেওয়াকে ‘দীর্ঘসূত্রতা’ ও ‘সময়ক্ষেপণ’ মন্তব্য করে সন্ত্রাসবিরোধী আইন থেকে এ ধারাটি বিলুপ্ত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।
পুলিশের যুক্তি, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দায়ের করতে হলে এজাহারসহ মামলাটি প্রথমে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে অবহিত করতে হয়। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সেটার ওপর মন্তব্য করে তা অনুমোদনের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠান। পুলিশের সদর দপ্তর মনে করে, এটি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা।
পুলিশের তিনজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলার অনুমোদনের জন্য জেলা প্রশাসক থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যন্ত যেতে হয়। তদন্ত, অভিযোগপত্র দাখিল ও চার্জ গঠন পর্যন্ত প্রতিটি স্তর পার হতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিতে হয়। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণে সময় ব্যয় হয়। সময় নির্ধারণ করে দেওয়ার ফলে দেখা যায় অভিযোগপত্র জমা দিতে দিতেই ৬০ দিন চলে যায়। সময় পার হয়ে গেলে আদালতে গিয়ে বিচার প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। অনেক সময়ক্ষেপণের কারণে মামলা খারিজ হয়।
পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক হাবিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, আইনের ৪০(২) ধারায় বলা হয়েছে, সরকারের পূর্বানুমোদন ছাড়া কোনো আদালত এই আইনের অধীন কোনো অপরাধ বিচারের জন্য আমলে নেবেন না। এখানে আইনে পরিষ্কার নয়, এ ক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকা কী। যেকোনো বিষয়ে তদন্তে পুলিশের একচ্ছত্র অধিকার রয়েছে। এমনকি তদন্তে আদালতও কখনো হস্তক্ষেপ করেন না। তিনি বলেন, সব আইনে পুলিশ যদি সরাসরি তদন্ত করতে পারে, তবে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে কেন পারবে না? আমরা চাই এই ধারা বিলুপ্ত হোক।
জানতে চাইলে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক প্রথম আলোকে বলেন, অনুমোদন প্রক্রিয়ার কারণে অনেক সময়ক্ষেপণ হয়। মামলা অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠালে তা ফেলে রাখা হয়। অনুমোদন না পাওয়ার ফলে বিচার বিলম্ব হয়। আসামিরা সুবিধা পায়।
সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯-এর ৪০-এর ২ উপধারা অনুযায়ী, অভিযোগপত্র দায়েরের আগে সরকারের অনুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা আছে। কিন্তু রাজধানীর বিভিন্ন থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের করা ১১৭টি মামলার ক্ষেত্রে সরাসরি আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ। এ কারণে মামলাগুলোর তদন্ত কর্মকর্তা ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এরপরই আইনের এই ধারা বিলুপ্তির দাবি জানাল পুলিশ।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আইনের কিছু বিষয়ে পুলিশের দ্বিমত রয়েছে। বিষয়টি পর্যালোচনা করছি। এ আইনে মামলা নেওয়ার উদ্দেশ্য হলো আসামিরা যাতে জামিন না পান এবং ৬০ দিনের মধ্যেই বিচার শেষ হয়। অভিযোগ রয়েছে, যথাসময়ে অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে না মামলাগুলো।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, বিশেষ আইনে সরকার সব সময় বিশেষ বিধান সংযোজন করে থাকে। ফৌজদারি কার্যবিধিতে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা রুজুর আগেও সরকারের অনুমোদন নিতে হয়। যেহেতু অপরাধগুলো রাষ্ট্র ও জননিরাপত্তার বিরুদ্ধে, সেহেতু সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকা জরুরি। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট যেহেতু জেলা পর্যায়ে সরকারের মুখ্য প্রতিনিধি, সেহেতু রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সরকারকে যথাসময়ে বাস্তব ঘটনা তুলে ধরতে পারে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আতিকুল হক এ বিষয়ে বলেন, ‘পুলিশ বলেছে, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সরকারের অনুমোদন নিতে হলে সময়ের অপচয় হয়। অন্য কোনো আইনে এ ধরনের ধারা নাই। তারা বলেছে, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মামলা তদন্তের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নন। এ জন্য সন্ত্রাসবিরোধী আইনের এ ধারাটির বিলুপ্ত চায় তারা। আমরা আমাদের মতামত তৈরি করেছি।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত আরেকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, কারও বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী মামলা হলে মৃত্যুদণ্ডও হতে পারে। তাই জেলা প্রশাসকের উচিত মামলা সঠিকভাবে করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করা।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লোকবল নেই বলে এমন হয়। অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা রাখতে হলে লোকবল বাড়াতে হবে। অনুমোদনের বাধ্যবাধকতায় দীর্ঘসূত্রতা হলে, অভিযুক্তরা খালাস পেয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
২০০৯ সালে সন্ত্রাসবিরোধী আইন প্রণয়ন করা হয়। তখন এ আইনে করা মামলায় দুই দফায় অনুমোদন লাগত। প্রথমে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমোদন, এরপর অভিযোগপত্র আমলে নিতে গেলে আদালতের কাছ থেকে অনুমোদন নিতে হতো। এ সময় বেশ কয়েকটি মামলায় জটিলতা দেখা দেওয়ায় ২০১৩ সালের জুনে আইনটি সংশোধন করা হয়। এখন জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে অবহিত করতে হবে। আর অভিযোগপত্র আমলে নিতে আদালতকে সরকারের অনুমোদন নিতে হবে।

Post source : প্রথম আলো

Related posts