নিজস্ব প্রতিবেদক | আপডেট: ০১:৩৯, জানুয়ারি ০৯, ২০১৭ | প্রিন্ট সংস্করণ
সাংসদ মনজুরুল ইসলাম হত্যার পেছনে পারিবারিক কলহ বা স্থানীয় দলীয় কোন্দল কাজ করেছে কি না, সেটাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শুরুতেই সরকার ও দলের পক্ষ থেকে জামায়াতে ইসলামীকে দায়ী করা হলেও একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পারিবারিক ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সুযোগ কাজে লাগিয়ে জামায়াত-শিবির বা জঙ্গি সংগঠন জেএমবি এ হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারে।
জেলা পুলিশও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সদস্য ও উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আহসান হাবিব ওরফে মাসুদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

আহসান হাবিবকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে জেলা পুলিশ সুপার মো. আশরাফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা কোনো না কোনো তথ্যের ভিত্তিতেই গ্রেপ্তার করেছি। জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। যে পর্যন্ত আমরা চূড়ান্ত কিছু না পাব, সে পর্যন্ত এ বিষয়ে কিছু বলা ঠিক হবে না।’

গত ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় সুন্দরগঞ্জে ঘরে ঢুকে গুলি করে সাংসদ মনজুরুল ইসলামকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় সুন্দরগঞ্জ থানায় মামলা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা ও দুজন সাংসদ প্রথম আলোকে বলেন, সাংসদের পরিবার ও স্বজনেরাও সন্দেহের ঊর্ধ্বে নন। পুলিশ তদন্তে যে তথ্য পেয়েছে, তাতে করে আরও অনুসন্ধানের প্রয়োজন রয়েছে। হুট করে জামায়াত বা শিবিরের নাম বলা বা তাদের দোষী করা ঠিক হবে না। এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গতকালও গাইবান্ধা পুলিশ প্রশাসনে ফোন করে এ ঘটনার অগ্রগতি বিষয়ে খোঁজখবর নিয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুজন সাংসদ গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, একজন সাংসদের বাড়িতে সন্ধ্যায় কোনো কর্মী বা লোকজন না থাকার বিষয়টি বিস্ময়কর।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, এ ঘটনার অনেকগুলো দিক রয়েছে। সবগুলো দিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তবেই একটি পর্যায়ে পৌঁছানো যাবে। হুট করে কিছু মন্তব্য করা যাবে না। ঘটনার সঙ্গে যে-ই জড়িত থাকুক, আওয়ামী লীগ হোক আর জামায়াত-শিবির হোক, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া রয়েছে।

গতকাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাংসদের বাড়িতে আসা পাঁচ যুবকের মধ্যে দুজন আরোহীসহ একটি মোটরসাইকেল বাড়ি থেকে একটু দূরে ছিল। অপর মোটরসাইকেলের তিনজন আরোহী তাঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য বাড়ির ভেতরে ঢোকেন। বসার ঘরে ঢোকার কিছুক্ষণের মধ্যে তাঁকে পাঁচটি গুলি করে দ্রুত পালিয়ে যান তাঁরা। গুলির শব্দ পেয়ে পরিবারের সদস্যরা বের হয়ে হামলাকারীদের মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যেতে দেখেন।

হত্যাকাণ্ডের সময় সাংসদের স্ত্রী খুরশীদ জাহান, স্ত্রীর বড় ভাই বেদারুল আহসান, গাড়িচালক মো. ফোরকান, ভাগনি স্মৃতি, গৃহকর্মী রোকসানা, বিলকিস, কাজের লোক সাজেদুল, ইউসুফ আলী ওই বাড়িতে ছিলেন। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্য নিয়োজিত ছিলেন না। আবার সাংসদের কাছে আগ্নেয়াস্ত্রও ছিল না।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জামায়াত-শিবিরের সংশ্লিষ্টতায়ও এ ঘটনা ঘটতে পারে। সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাধীনতা-উত্তর সময় থেকে জামায়াত-অধ্যুষিত এলাকা। সাংসদ মনজুরুল ইসলাম সব সময়ই জামায়াতের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। এ কারণ জামায়াত তাঁর প্রতি ক্ষুব্ধ ছিল।

তদন্তের ব্যাপারে জানতে চাইলে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক প্রথম আলোকে বলেন, এ বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত চলছে। আরও অনেক সময় লাগবে।

গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, গ্রেপ্তার হওয়া সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আহসান হাবিব স্বেচ্ছাসেবক লীগের সঙ্গে যুক্ত বলে এলাকায় সবাই জানলেও সংগঠনটির নেতারা এখন তা অস্বীকার করছেন।

এদিকে হত্যার আট দিনেও রহস্য উদ্‌ঘাটিত না হওয়ায় এবং খুনিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে গতকাল সুন্দরগঞ্জে পাঁচ কিলোমিটারব্যাপী মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, গত শনিবার রাতে আহসানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আহসানের পরিবার জানায়, শুক্রবার তাঁকে আটক করে পুলিশ। সুন্দরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিয়ার রহমান বলেন, আহসান হাবিবকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত কি না, জিজ্ঞাসাবাদে তা জানা যাবে।

এদিকে আহসান হাবিবসহ গত শনিবার গ্রেপ্তার হওয়া জামায়াতের ছয়জন নেতাকে পুলিশ আদালতে নিয়ে রিমান্ড চাইলে গাইবান্ধার অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম ময়নুল হাসান ইউসুফ তাঁদের প্রত্যেকের সাত দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড মঞ্জুর হওয়া জামায়াতের ছয়জন নেতা হলেন ফরিদ মিয়া, সামিউল ইসলাম, হাদিসুর রহমান, জিয়াউর রহমান, হজরত আলী ও নবিনুর খন্দকার।

জামায়াতের নেতাদের রিমান্ডে নেওয়ার বিষয়ে সুন্দরগঞ্জ থানার ওসি আতিয়ার রহমান বলেন, সাংসদ হত্যায় গ্রেপ্তারকৃতদের সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, সে জন্য জিজ্ঞাসাবাদ করতে প্রত্যেকের সাত দিন করে রিমান্ড চাওয়া হয়। শুনানি নিয়ে আদালত তা মঞ্জুর করেছেন। জামায়াতের এই নেতাদের বিরুদ্ধে সুন্দরগঞ্জ থানায় নাশকতার মামলা রয়েছে।

সাংসদ মনজুরুল হত্যায় জামায়াতকে সন্দেহ করে আওয়ামী লীগের সকল পর্যায়ের নেতারা বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে আসছেন। এ পর্যন্ত জামায়াত-শিবিরের প্রায় ৩৫ জন নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আবদুল করিম।

এর মধ্যে স্বেচ্ছাসেবক লীগের সদস্য গ্রেপ্তার হওয়ায় জেলায় এ নিয়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। আহসান হাবিব নিজেকে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা পরিচয় দিতেন। এলাকার লোকজনও তা-ই জানতেন। তবে গতকাল সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি গোলাম কবির প্রথম আলোকে বলেন, ‘উপজেলা কমিটিতে আহসানের কোনো পদ নেই।’

আহসানের গ্রেপ্তার হওয়ার পর গতকাল সুন্দরগঞ্জ উপজেলা সদরে তাঁর বাড়িতে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। পরে মুঠোফোনে তাঁর বড় ভাই গোলাম মর্তুজা দাবি করেন, সাংসদ মনজুরুলের সঙ্গে আহসানের কোনো বিরোধ ছিল না। ওই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আহসানের কোনো সম্পৃক্ততাও নেই। ষড়যন্ত্রমূলকভাবে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে।

আহসানের পরিবার ও এলাকার রাজনীতিকদের কাছ থেকে জানা যায়, ১৯৮৮ সালে এসএসসি পাসের পর রংপুর কারমাইকেল কলেজে ভর্তি হয়ে জাসদ ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত হন আহসান। ওই কলেজে ছাত্রশিবিরের দুই নেতাকে হত্যা মামালার আসামি হয়ে কারাভোগও করেন তিনি। ২০০৮ সালে জাতীয় পার্টির সমর্থন নিয়ে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর ২০০৯ সালে তিনি উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগে যোগ দেন। ২০১০ সালের ২০ মার্চ উপজেলা আওয়ামী লীগের এক বর্ধিত সভা সুন্দরগঞ্জ টাউন হলে অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে হট্টগোল হয়। তখন আহসান হাবিবের নেতৃত্বে কিছু নেতা-কর্মী তৎকালীন সুন্দরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মনজুরুল ইসলামকে মারধর করেন বলে এলাকাবাসী জানান।