রোজিনা ইসলাম | আপডেট: ০১:৪৬, ডিসেম্বর ২৮, ২০১৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

.নিজস্ব ভবনে নিজস্ব খরচে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) জন্য ‘সাব-জেল’ গড়তে সরকারের কাছে প্রস্তাব দিয়েছে ডেসটিনি গ্রুপ। এই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চেয়ারম্যান এখন কারাবন্দী। সরকারি কোষাগারে ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা জমা দিলে তাঁরা জামিনে মুক্তি পাবেন বলে সম্প্রতি সিদ্ধান্ত দিয়েছেন সর্বোচ্চ আদালত।
ডেসটিনির যুক্তি হচ্ছে, সরকারি কোষাগারে টাকা জমা দিতে হলে ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল আমীনের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের ঘন ঘন বৈঠক করতে হবে। তাই সুবিধামতো জায়গায় বৈঠক করতে একটি সাব-জেল গঠন করা প্রয়োজন।
বহুস্তর বিপণনপদ্ধতিতে (এমএলএম) সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে বিতর্কিত এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। প্রায় চার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে ইতিমধ্যে এই গ্রুপের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে করা মামলার বিচার শুরু হয়েছে।
ডেসটিনি গ্রুপের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাজধানীর বাংলামোটরের নাসির ট্রেড সেন্টারের সপ্তম তলায় ডেসটিনির একটি ফ্লোরে ডেটা সেন্টার, সার্ভারসহ সব দাপ্তরিক সরঞ্জামের ব্যবস্থা আছে। সেই জায়গা রফিকুল আমীনের আবাসনের ব্যবস্থা এবং দাপ্তরিক কার্যাবলি পরিচালনার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান হবে। তবে জেল কর্তৃপক্ষ যেখানে উপযুক্ত মনে করবে, সেখানেও সাব-জেলের ব্যবস্থা করতে পারে।

১৯ ডিসেম্বর স্বরাষ্ট্রসচিবের কাছে এক চিঠিতে এ প্রস্তাব দিয়েছেন ডেসটিনি ট্রি প্ল্যান্টেশন লিমিটেডের কোম্পানি সচিব। এই চিঠি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন), ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেল সুপার ও জেলারকেও পাঠানো হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল চিঠি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে প্রথম আলোকে বলেন, এ বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে।

তবে এভাবে সাব-জেল গঠনের কোনো নজির দেশে নেই বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। শুধু দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলের দুই নেত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদ বিশেষ পরিস্থিতিতে সাব-জেলে ছিলেন।

জানতে চাইলে আইনজীবী শাহদীন মালিক প্রথম আলোকে বলেন, আদালতের আদেশের ছুতো ধরে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা আদায় করা বাংলাদেশের ধনীদের জন্য সব সময়ই সম্ভব। একইভাবে হাসপাতালে নানা রোগের দোহাই দিয়ে রফিকুল আমীন ১৪ মাস ধরে সব সুবিধা নিয়ে আসছেন। আইনে অনুমোদিত না হলেও তাঁরা শেষ পর্যন্ত সব ধরনের সুবিধা নেন, যেটা অনেক বড় অপরাধ। এ ধরনের আবদার বা প্রস্তাব কীভাবে করেন, তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন বিশিষ্ট এই আইনজীবী।

কাগজে-কলমে বলা হয়েছে, ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল আমীন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী রয়েছেন। তবে ‘রোগী’ হিসেবে ২০১৫ সালের ২৬ নভেম্বর থেকে তিনি বারডেম হাসপাতালে রয়েছেন। তিনি প্রথম শ্রেণির বন্দীর মর্যাদাও পাচ্ছেন। কারাগারের নথিপত্রে তাঁর বিভিন্ন রোগের কথা বলা হয়েছে।

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ জেল সুপার জাহাঙ্গীর কবির প্রথম আলোকে বলেছেন, চিকিৎসকের পরামর্শে তাঁকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। সাব-জেল গঠনের বিষয়ে তিনি বলেন, সরকার চাইলে যেকোনো স্থানে জরুরি ভিত্তিতে সাব-জেল গঠন করতে পারে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ডেসটিনি গ্রুপের কর্মকর্তারা বলেছেন, আদালত রফিকুল আমীনকে ডেসটিনি ট্রি প্ল্যান্টেশন লিমিটেডের ৩৫ লাখ গাছ বিক্রি করে ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানের কাছে জমা দেওয়ার আদেশ দিয়েছেন। রফিকুল আমীন, কোম্পানি পরিচালনা পর্ষদের অন্যান্য সদস্য ও ডেসটিনি ট্রি প্ল্যান্টেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ শামসুল হক ভূঁইয়াকে অত্যন্ত স্বল্প সময়ের নোটিশে আলোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন।

ডেসটিনি গ্রুপের দাবি, পরিচালনা পর্ষদের অন্য সদস্যদের সঙ্গে তাৎক্ষণিক বৈঠক ও জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য এমন এক জায়গায় রফিকুল আমীনের উপস্থিতির প্রয়োজন, যেখানে স্বল্প সময়ের নোটিশে সভা করা যায়। এ ছাড়া আদালতের আদেশ বাস্তবায়নের জন্য এবং কর্মকর্তাদের বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়ার জন্য ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করাও জরুরি। তাই একটি সাব-জেল করা জরুরি।

ডেসটিনি ট্রি প্ল্যান্টেশন লিমিটেডের সচিব মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বোর্ডের অনুমতি ছাড়া একটি গাছও বিক্রি করা সম্ভব নয়। এ ছাড়া গাছ বিক্রির জন্য আমাদের দরপত্র আহ্বানপ্রক্রিয়া থেকে শুরু করে পরামর্শ অনুমোদনের জন্য ব্যবস্থাপনা পরিচালককে লাগবে। এ জন্য সাব-জেল করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।’

প্রসঙ্গত, গত ১৩ নভেম্বর দেশের সর্বোচ্চ আদালত সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে করা দুই মামলায় ডেসটিনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল আমীন ও ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসেন সরকারি কোষাগারে অর্থ জমা দেওয়ার পর জামিনে মুক্তি পাবেন। আদালত গাছ বিক্রি করে ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিতে বলেছেন। ডেসটিনি ট্রি প্ল্যান্টেশন লিমিটেডের বিক্রির উপযোগী ৩৫ লাখ গাছ বিক্রির জন্য ছয় সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছে। আদালত বলেছেন, এর পরিবর্তে নগদ আড়াই হাজার কোটি টাকা জমা দিলেও তাঁরা জামিনে মুক্তি পাবেন।

একই সঙ্গে আপিল বিভাগ ওই গাছ বিক্রির জন্য ডেসটিনি ট্রি প্ল্যান্টেশন লিমিটেডের সিইও শামসুল হক ভূঁইয়া কারাগারে থাকা ওই দুই কর্মকর্তার কাছে যেন যেতে পারেন, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে এবং সহযোগিতা করতে ঢাকা ও কাশিমপুর কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন।

উল্লেখ্য, ৪ হাজার ১১৯ কোটি ২৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে ডেসটিনি গ্রুপের বিরুদ্ধে করা দুটি মামলার বিচারকাজ গত আগস্টে শুরু হয়েছে। ডেসটিনি গ্রুপের প্রেসিডেন্ট লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) হারুন-অর-রশিদ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রফিকুল আমীনসহ ৫৩ জন এ দুই মামলার আসামি।