রোজিনা ইসলাম | আপডেট: ০২:১৮, ফেব্রুয়ারি ০৫, ২০১৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

শেখ মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন‘কাঁদতে কাঁদতে আমার চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না আমার ছেলেটাকে। র্যা ব, পুলিশ, রাজনৈতিক ব্যক্তি–সবার কাছে গেছি। কিন্তু কেউ কোনো খোঁজ দিতে পারছেন না। যেভাবেই হোক ছেলেকে ফেরত চাই’—এই আকুতি ছাত্রলীগের নিখোঁজ নেতা মোয়াজ্জেম হোসেনের মা সালেহা বেগমের।
সালেহা বেগম প্রথম আলোর কাছে গত বুধবার এভাবে আকুতি প্রকাশ করেন। ১১ দিন ধরে নিখোঁজ মোয়াজ্জেমের পুরো নাম শেখ মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন (তপু)। তাঁর পরিবারের অভিযোগ, গত ২৬ জানুয়ারি রাতে বাড্ডার একটি বাসা থেকে সাধারণ পোশাকের তিন ব্যক্তি মোয়াজ্জেমকে তুলে নিয়ে গেছেন। এরপর থেকে তাঁর কোনো খোঁজ নেই, মুঠোফোন নম্বরও বন্ধ। এ ব্যাপারে ভাটারা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ও পরে মামলা করা হয়েছে। কিন্তু গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কোনো খোঁজ মেলেনি।
পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থা বলেছে, মোয়াজ্জেমকে তারা আটক করেনি।
পারিবারিক সূত্র বলেছে, মোয়াজ্জেম একাধিকবার রামপুরা থানা ও ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগ দক্ষিণের শ্রেষ্ঠ সংগঠক হিসেবে পুরস্কৃতও হন। তিনি রামপুরার আলী হায়দার স্কুলের গভর্নিং বডির বর্তমান চেয়ারম্যান। মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সভাপতি পদে প্রার্থী হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন মোয়াজ্জেম। তবে স্থানীয় যুবলীগের সঙ্গে মোয়াজ্জেমদের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ছিল। পুলিশ যুবলীগের পক্ষে ছিল।
সালেহা বেগম বলেন, তাঁর ছেলেকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুম করা হয়েছে। তিনি ছেলের সন্ধান পাওয়ার আশায় ২৯ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের কাছে গিয়েছিলেন। মন্ত্রী এ বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। কিন্তু তাঁরা জানিয়েছেন, মোয়াজ্জেম তাঁদের কাছে নেই। ৩০ জানুয়ারি তিনি আবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করলে মন্ত্রী পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তাদের বিষয়টি খোঁজ নিতে বলেছেন। কিন্তু এখনো কোনো খোঁজ মেলেনি।
পারিবারিক সূত্র বলেছে, নিখোঁজের ঘটনায় গত শনিবার ভাটারা থানায় জিডি ও ১ ফেব্রুয়ারি অপহরণের অভিযোগ এনে মামলা করেন সালেহা বেগম। মোয়াজ্জেমের গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার খাজুরিয়ায়। তাঁর নানার বাড়িও ফরিদগঞ্জে।
এজাহারে বলা হয়, ২৬ জানুয়ারি ফরিদগঞ্জ থেকে লঞ্চযোগে ঢাকার সদরঘাটে নেমেছিলেন মোয়াজ্জেম। সেখান থেকে মোটরসাইকেলে বন্ধু তাজুলের সঙ্গে বাড্ডার একটি বাসায় যান। তাজুল কফি খাওয়ার কথা বলে বাইরে গেলে তিনজন লোক ওই বাসায় গিয়ে মোয়াজ্জেমের কাছে জানতে চান, তিনি কবে চাঁদপুর থেকে ফিরেছেন। পরে সেদিন রাত সোয়া ১১টায় তাঁকে শোয়া অবস্থা থেকে তুলে নিয়ে যান ওই তিন ব্যক্তি। রাত সাড়ে ১১টায় বন্ধু ইমন মোয়াজ্জেমের ভাই চিকিৎসক মাইনুল হোসেনকে মুঠোফোনে জানান, মোয়াজ্জেমকে তিনজন লোক ভয় দেখিয়ে অপহরণ করে নিয়ে গেছে। এজাহারে মোয়াজ্জেমের বন্ধু ইমন, তাজুল, শিবলু, তানিম, রইছ উদ্দিন, অর্ণব, জুয়েল ও এক তরুণীর নাম উল্লেখ করা হয়।
মইনুল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, স্থানীয় যুবলীগের সঙ্গে তাঁর ভাইয়ের পক্ষের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ছিল। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনও তাঁর ভাইয়ের বিপক্ষে ছিল। মোয়াজ্জেম নিখোঁজ হওয়ার কদিন আগে তাঁদের বাসার সামনে-পেছনে পুলিশের পাহারায় ৫০ থেকে ৬০টি মোটরসাইকেল নিয়ে যুবলীগ মহড়া দেয়। এ ছাড়া পুলিশের সহায়তা নিয়ে যুবলীগ তাঁর ভাইয়ের বিরুদ্ধে পোস্টারিংও করেছে। তিনি বলেন, ‘আমার ভাইয়ের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে, গ্রেপ্তারের ভয়ে ভাই বাসায় থাকতেন না। আমার ধারণা, পুলিশ এ বিষয়ে নিশ্চয়ই জানে।’
মইনুল বলেন, ‘আমার ভাই যদি অপরাধী হন তবে তাঁর নিশ্চয়ই শাস্তি হওয়া উচিত। কিন্তু তাঁকে গুম করে ফেলা হলো, এটা কোন বিচার!’
জানতে চাইলে রামপুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম গত বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশ পাহারায় কিছুই হয়নি। বরং পুলিশ গিয়ে যুবলীগের মহড়া বন্ধ করেছে। তিনি বলেন, ‘আমি গত নভেম্বরে এ থানায় যোগ দেওয়ার পর থেকেই দেখছি যুবলীগ ও ছাত্রলীগের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছে। সেই দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে গোলাগুলিও হয়েছে। মোয়াজ্জেমের নিখোঁজের বিষয়ে ভাটারা থানার পুলিশ তদন্ত করছে।’
অপহরণ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ভাটারা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শরীফ হোসেন বলেন, তিনি তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছেন ২ ফেব্রুয়ারি। এখনো কোনো অগ্রগতি হয়নি।
জানতে চাইলে স্থানীয় সাংসদ এ কে এম রহমতউল্যা প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওদের (মোয়াজ্জেমদের) যুবলীগের সঙ্গে গন্ডগোল ছিল, এর বেশি কিছু জানি না। তবে আমরা পুলিশ কমিশনারসহ সবার কাছে সহায়তা চেয়েছি তাঁকে খুঁজে বের করতে।’
এলাকা সূত্র বলেছে, গত ১৯ নভেম্বর যুবলীগ ও ছাত্রলীগের দ্বন্দ্বের জেরে রামপুরায় একটি হরতালবিরোধী মিছিলে হামলা ও গুলি হয়। কিছুদিন আগে ‘রামপুরাবাসীর পক্ষ থেকে’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে একটি অভিযোগ দেওয়া হয়। অভিযোগে বলা হয়, রামপুরা এলাকায় সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসাসহ একের পর এক খুনোখুনির ঘটনা ঘটছে। কিন্তু রামপুরা থানা-পুলিশ ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ রহস্যজনক কারণে দুর্বৃত্তদের আটক করছে না।
মোয়াজ্জেমের পরিবার বলেছে, নিখোঁজ হওয়ার কয়েক দিন আগে প্রাণ হারানোর আশঙ্কা করে মোয়াজ্জেম চার পাতার একটি নোট লিখেছিলেন। সেখানে স্থানীয় রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও পুলিশের অসহযোগিতার কথা উল্লেখ করেছিলেন।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘র্যা ব বা পুলিশ মোয়াজ্জেম হোসেনকে নেয়নি। আমরা খতিয়ে দেখছি কী হলো।’ তিনি বলেন, ‘ও খুবই ভালো নেতা, আমার কাছে প্রায়ই আসত, কী থেকে কী হয়ে গেল, বুঝতে পারছি না। তার পরিবারের সদস্যরা মোয়াজ্জেমের সন্ধান পেতে সহায়তা চাইতে এখনো আমার বাসায় আছেন।’