পাঁচ আবাসিক এলাকার অবৈধ ও বাণিজ্যিক স্থাপনা উচ্ছেদ হবে

ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী উত্তরা ও বারিধারা

রোজিনা ইসলাম | ১৪ জানুয়ারি, ২০১৬
রাজধানীর ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী, উত্তরা ও বারিধারা আবাসিক এলাকার সব অবৈধ ও বাণিজ্যিক স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে। ইতিমধ্যে ওই পাঁচ এলাকার সমীক্ষা শেষ হয়েছে। বাস্তব অবস্থা দেখতে আজ বৃহস্পতিবার রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) কয়েকটি দল এসব এলাকা পরিদর্শন করবে। আগামী সপ্তাহে শুরু হবে উচ্ছেদ অভিযান। তবে এখনই স্কুল ও হাসপাতাল উচ্ছেদ না করে সেগুলোকে স্থানান্তরে নোটিশ দেওয়া হবে।
অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের তালিকায় রয়েছে বার, গেস্টহাউস, বেসরকারি কমিউনিটি সেন্টার, ফিটনেস সেন্টার, স্পা, বিউটি পারলার, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, ক্লিনিক, কলেজ, কোচিং সেন্টার, বুটিকের দোকান। এ ছাড়া আবাসিক এলাকার কোনো প্লটে কেউ যদি বেসমেন্ট বা ভূতলের গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা বন্ধ রাখেন বা বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করেন, সেগুলোও উচ্ছেদ করা হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলেছে, আবাসিক এলাকায় বারের লাইসেন্স বাতিল করা, লাইসেন্স নবায়ন না করা এবং নতুন কোনো লাইসেন্স না দেওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেবে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।
জানতে চাইলে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী মোশাররফ হোসেন গতকাল বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা তাঁদের ঘরবাড়ি করার অনুমতি দিয়েছি, তাঁরা সেখানে গাড়ির শোরুম, রেস্টহাউস করেছেন। সেটাকে বাণিজ্যিক এলাকা করেছেন।’
এ উদ্যোগ কার্যকর হবে কি না, জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ‘অ্যাট অ্যানি কস্ট আবাসিক এলাকা থেকে অবৈধ সব স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে। তবে স্কুল ও হাসপাতালকে নোটিশ দিয়ে স্থানান্তর করার সময় দেব। যদি কেউ রাজউকের নির্দেশ না মানেন, তবে তাঁর বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেব, তা-ও দেখবেন। আমরা আগামী সোমবার থেকে অ্যাকশনে যাব।’ তিনি বলেন, ‘যদি কেউ দুর্নীতিতে ডুবে যায়, তবে কোনো উদ্যোগই কার্যকর হয় না। আমরা এই অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ পরিচালনা করে দেখিয়ে দেব আমরা কতটা স্বচ্ছ।’
গত ২৯ ডিসেম্বর গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকের কার্যবিবরণীতে বলা হয়, শিল্প, বাণিজ্যিক বা আবাসিক—যা-ই হোক না কেন, কেউ যদি বেসমেন্ট বা গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা বন্ধ করে রাখেন বা বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করেন, সেগুলো সব উচ্ছেদ করা হবে। সিটি করপোরেশন সেখানে ট্রেড লাইসেন্স দেবে না। আবাসিক এলাকায় কোনো হোটেল, গেস্টহাউস, রেস্টুরেন্ট থাকতে পারবে না।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দুজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক কার্যক্রম মহানগরে ব্যাপক সমস্যার সৃষ্টি করছে। এর সমাধান করতে হবে। তবে যাঁরা এখানে কাজ করছেন, তাঁদের জীবন-জীবিকার দিকেও লক্ষ রাখতে হবে। যেখানে ব্যবসায়িক কার্যক্রম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করছে, সেখানে অবশ্যই কঠোর হতে হবে। তবে হঠাৎ করে এত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়নি। রাজউকের নীতিমালার মধ্যেও সমস্যা রয়েছে।
গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, অনেকেই সীমিত আকারে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের অনুমোদন নিয়ে অনেক বেশি বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালাচ্ছেন।
তবে সিটি করপোরেশন সূত্র বলেছে, আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক কার্যক্রমের লাইসেন্স সিটি করপোরেশন দেয় না। ২০০৭ সালের পর থেকে এটা একেবারেই বন্ধ রয়েছে। অনেকেই বাণিজ্যিক এলাকার ঠিকানায় ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে আবাসিক এলাকায় ব্যবসা করেন।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে গণপূর্তমন্ত্রী বলেন, ট্রেড লাইসেন্স মানে কারও অধিকার নয়। জমির মালিক রাজউক বা জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ বা গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। সেখানে কেউ ব্যবসা-বাণিজ্য করলে তার জন্য ট্রেড লাইসেন্স নেয়। এই ট্রেড লাইসেন্স কাউকে জমির মালিকানা বা বন্দোবস্ত দেয় না। আইনগতভাবে ট্রেড লাইসেন্স না নিয়ে ব্যবসা করা দণ্ডনীয় অপরাধ।
গণপূর্ত ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলেছে, অনেক ক্ষেত্রে আবাসিক প্লটে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অনুমতির ক্ষেত্রে রাজউকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই জড়িত থাকেন। রাজউকের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো যথাযথ পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং এর সঠিক বাস্তবায়ন। কিন্তু কর্তৃপক্ষের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে আবাসিক এলাকায় শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক কেন্দ্র, শপিং কমপ্লেক্স ইত্যাদি গড়ে ওঠায় জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক স্থাপনার বিষয়ে দুজন সাবেক মন্ত্রী রাজউককে চিঠি দিয়েছেন। তাঁদের একজন চিঠিতে বলেছেন, তাঁর বাসা গুলশান আবাসিক এলাকায়। এখানে কোনো ধরনের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান স্থাপন সম্পূর্ণ নিষেধ। বর্তমানে তাঁর এলাকায় একটি ১৪ তলা ভবন নির্মিত হচ্ছে। এফএআর ডিজাইন অনুযায়ী আবাসিক মর্যাদা নিয়ে বাড়ি নির্মিত হওয়ার কথা। কিন্তু বাড়ির উচ্চতা, ডিজাইন দেখে মনে হয় যে এফএআর ডিজাইন অনুযায়ী বাড়িটি নির্মিত হচ্ছে না, এমনকি অ্যাপার্টমেন্ট বাড়ি হিসেবেও নির্মাণ করা হচ্ছে না। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাড়িটি গেস্টহাউস বা হোটেল হিসেবে নির্মাণ করা হচ্ছে। চিঠিতে আরও বলা হয়, ‘এখানে গেস্ট হাউস/হোটেল বা বাণিজ্যিকভাবে কোনো প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করলে এলাকার আবাসিক মর্যাদা সম্পূর্ণ বিনষ্ট হবে। আমি জানি না, রাজউক কোন নীতি অনুসরণ করে এ বাড়ি নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে।’
রাজউকের চেয়ারম্যান জি এম জয়নাল আবেদীন ভুইয়া বলেন, অবৈধ ও বাণিজ্যিক স্থাপনা উচ্ছেদে রাজউকের তিনটি দল গঠন করা হয়েছে। সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ না হওয়া পর্যন্ত এই সাঁড়াশি অভিযান চলবে।

Related posts