নিয়মিত কাজ করছেন কিন্তু দশ মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না!

রোজিনা ইসলাম | ০৯ জানুয়ারি, ২০১৬

দৌড়ে এক কক্ষ থেকে আরেক কক্ষে যাচ্ছেন নথিপত্র নিয়ে। অফিসের সব দাপ্তরিক কাজ করছেন। কর্মকর্তাদের সব ফরমায়েশও পালন করছেন। কিন্তু বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না ১০ মাস ধরে। এতে পরিবার নিয়ে তাঁদের দিন কাটছে মানবেতরভাবে। এর ওপর এখন যুক্ত হয়েছে চাকরি হারানোর শঙ্কা। এ পরিস্থিতিতে পড়েছেন মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে কাজ করা ১০৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী।

মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে কাজ করলেও তাঁরা প্রেষণে এসেছেন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ থেকে, যার দেখভাল করে মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক মন্ত্রণালয়ই। ২০০২ সালে এই মন্ত্রণালয় গঠনের পর চাহিদার ভিত্তিতে তাঁদের মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। তবে রাজস্ব খাতে নেওয়া হয়নি তাঁদের চাকরি।

এই ১০৪ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতা বন্ধ হলেও এখন তাঁদের দায়িত্ব নিতে চাইছে না মন্ত্রণালয় বা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কেউ। মন্ত্রণালয় বলছে, তাঁরা সংসদের নিয়োগ দেওয়া। আর সংসদ বলছে, তাঁরা কাজ করছেন মন্ত্রণালয়ে; কাজেই মন্ত্রণালয় টাকা না দিলে তাঁদের বেতন হবে কীভাবে?

মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলেছে, ২০০২ সালে এই মন্ত্রণালয় গঠনের পর জনবল কম থাকায় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ থেকে লোক চাওয়া হয়। এরপর বিভিন্ন সময় সেখান থেকে এই কর্মচারীদের প্রেষণে মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়। এঁরা কাজ করছেন সনদ শাখার ইনচার্জ, মন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, অফিস সহকারী, কম্পিউটার অপারেটর ও অফিস-সহায়কসহ বিভিন্ন পদে। তাঁরা বলেছেন, কেউ কেউ শুরু থেকে আবার কেউ তিন বছর আগে থেকে মন্ত্রণালয়ে কাজ করছেন। মন্ত্রণালয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন হাটবাজার ইজারা থেকে আয়ের ৪ শতাংশ বরাদ্দ দিত মুক্তিযোদ্ধা সংসদকে। সংসদ ওই টাকায় তাঁদের বেতন দিত। ২০০২ সাল থেকে তাঁরা এভাবে চেকের মাধ্যমে বেতন-ভাতা পেয়েছেন। ২০০৮ সালে ওই বরাদ্দ কমিয়ে ২ শতাংশ করা হয়। ওই বেতনে চলেছে তাঁদের সংসার, বাসা ভাড়া ও সন্তানদের লেখাপড়া। কিন্তু ১০ মাস আগে হঠাৎ করে মন্ত্রণালয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদকে ওই বরাদ্দ বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে বন্ধ হয়ে গেছে তাঁদের বেতন। এতে কারও কারও সন্তানদের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেছে। কেউ আবার পরিবার পাঠিয়ে দিয়েছেন গ্রামে। গত দুই ঈদে তাঁরা বেতন-উৎসব ভাতা কিছুই পাননি।

গতকাল বৃহস্পতিবার মন্ত্রণালয়ে গেলে কাজে ব্যস্ত দেখা যায় তাঁদের। বেতন না পাওয়ায় মানবেতর জীবনযাপনের কথা বললেন এই প্রতিবেদককে। তাঁরা এই অবস্থার সুরাহা চান, চাকরি বহাল চান। অন্যথায় তাঁদের যে পাওনা বকেয়া রয়েছে, তা পরিশোধ করতে বলেন।

১০৪ জনের একজন মুক্তিযুদ্ধ সনদ শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহবুবুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা শ্রমের বিনিময়ে পারিশ্রমিক নিই। কাজে কোনো গাফিলতি নেই। এরপরও কেন আমাদের বেতন-ভাতা বন্ধ করা হলো, তা আমরা জানি না। প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী হিসেবে প্রেষণে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের শুরু থেকে কাজ করে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে হঠাৎ বেতন বন্ধ করে দেওয়ায় অসহায় হয়ে পড়েছি।’ তিনি বলেন, এ বিষয়ে তাঁরা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্রধান উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের ব্যাপারে কেউ কোনো সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন না। অথচ আমাদের দিয়ে সব কাজ করাচ্ছেন। এটা কেমন নিয়ম!’

এ বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এম এ হান্নান প্রথম আলোকে বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কর্মচারীদের বেতন দিতে হাটবাজারের ইজারার অংশের টাকা সংসদকে দেওয়া যাবে না। নীতিমালা অনুযায়ী এ টাকা দেওয়ার কথা অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে। তাঁদের চিকিৎসা ও শিক্ষার জন্য, বেতনের জন্য নয়। এমন প্রায় ১০০ জন আছেন, যাঁরা মন্ত্রণালয়ের নয়, মুক্তিযোদ্ধা সংসদের জনবল। এতজনকে প্রেষণে কেন আনা হয়েছিল, কোন প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তা আমার জানা নেই। আগে যাঁরা মন্ত্রণালয়ে দায়িত্বে ছিলেন, তাঁরা জানেন।’

এই কর্মচারীদের এখনো কাজ করার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে এম এ হান্নান বলেন, ‘তাঁরা চাইলে চলে যেতে পারেন, আমরা তাঁদের আটকে রাখিনি।’

মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হেলাল মোর্শেদ খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরকার টাকা না দিলে আমি কোথা থেকে এই কর্মচারীদের বেতন দেব। ওরা মন্ত্রণালয়ে কাজ করছে, ওদের ভালো-মন্দ দেখার দায়িত্ব মন্ত্রণালয়েরই।’

মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা অর্থ মন্ত্রণালয়ে দুই কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়ে আধা সরকারি পত্র পাঠিয়েছি। বরাদ্দ পেলে এই কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হবে। এরপর এই কর্মচারীদের নিয়ে কী করা হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ।’

Related posts