রোজিনা ইসলাম | ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৫

 

মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজে একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনী এখানেই বাঙালিদের হত্যা করত l ছবি: প্রথম আলো
মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজে একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনী এখানেই বাঙালিদের হত্যা করত l ছবি: প্রথম আলো

মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজে একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনী এখানেই বাঙালিদের হত্যা করত l ছবি: প্রথম আলোরাজধানীর মিরপুরের বিভিন্ন স্থানে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর যে বধ্যভূমিগুলো স্বাধীনতার পরে আবিষ্কৃত হয়েছে, তার মধ্যে সরকারি বাঙলা কলেজ অন্যতম। তবে এখনো বধ্যভূমি সংরক্ষণ করা হয়নি। বধ্যভূমিতে সৌধ নির্মাণের জন্য কলেজের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে স্থাপত্য অধিদপ্তর একটি নকশা করেছিল। কিন্তু তা আর বাস্তবায়িত হয়নি। এমনকি সেই নকশারও হদিস মিলছে না।
মিরপুরে ১০টি বধ্যভূমি চিহ্নিত হয়েছে, এর মধ্যে সরকারি বাঙলা কলেজ অন্যতম। কলেজের বড় গেট ও শহীদ মিনারের মাঝামাঝি জায়গায় ১৯৭১ সালে ছিল একটি পুকুর। এই পুকুর পাড়ে মুক্তিকামী বাঙালিদের লাইন করে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হতো। মিরপুরে বুদ্ধিজীবীদেরও হত্যা করা হয়েছিল।
কলেজের বধ্যভূমি সংরক্ষণ ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবিতে ২০০৭ সাল থেকে আন্দোলন শুরু করে তৎকালীন শিক্ষার্থীরা। গঠিত হয় ‘বাঙলা কলেজ বধ্যভূমি সংরক্ষণ উদ্যোক্তা কমিটি।’ আন্দোলন ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিশ্ব জনমতকে সম্পৃক্ত করার জন্য প্রয়াস নেওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৯ সালে মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ‘বধ্যভূমি সংরক্ষণ ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ’ প্রকল্পে বাঙলা কলেজকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু সাত বছর পার হলেও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়নি। এই প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে দেশের ২০৪টি বধ্যভূমির নাম অন্তর্ভুক্ত করা হলেও সেখানে নেই বাঙলা কলেজের নাম। এমনকি মন্ত্রণালয়ের আদেশে গণপূর্ত অধিদপ্তর কলেজটির জন্য যে নকশা তৈরি করেছিল, সেটিও পাওয়া যাচ্ছে না।
জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক তাঁর মন্ত্রণালয়ে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ডেকে এনে বিষয়টি জানতে চান। নকশাটি কোথায় গেল সে বিষয়ে কোনো জবাব দিতে পারেননি কর্মকর্তারা। পরে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বিষয়টি তদন্ত করা হবে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাঙলা কলেজের বধ্যভূমি সংরক্ষণ ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হবে বলে তিনি জানান।
মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বধ্যভূমি সংরক্ষণ ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা না হলেও কলেজ কর্তৃপক্ষের অবহেলায় চিহ্নিত স্থানগুলোও অরক্ষিত। কলেজটিতে চালু হওয়া ‘মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি গ্যালারি’ সব সময় তালাবদ্ধ থাকে। ২ ডিসেম্বর থেকে কলেজের মাঠে মুক্তিযুদ্ধের আলোকচিত্র প্রদর্শনী শুরু হলেও সেখানে নেই বাঙলা কলেজ বধ্যভূমি-সংক্রান্ত তথ্য। কোথাও কোথাও দেখা গেছে আবর্জনার স্তূপ। ২০১০ সালের ডিসেম্বরে সেই সময়ের কলেজের অধ্যক্ষ দিলারা হাফিজ একটি টেরাকোটার ফলকে বাঙলা কলেজ বধ্যভূমির সংক্ষিপ্ত তথ্য প্রশাসন ভবনের দেয়ালে স্থাপন করেন। সেই পোড়ামাটির ফলকটিও আসবাবপত্রের আড়ালে ধুলোয় মলিন।
জানতে চাইলে কলেজের অধ্যক্ষ ইমাম হোসেন বলেন, ‘কলেজ কর্তৃপক্ষের এ ব্যাপারে কোনো অবহেলা নেই। আমরা গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি দেখছি। ইতিমধ্যে একটি কমিটি করেছি। এ ক্ষেত্রে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন। আমরা অনেক তথ্য খুঁজে বের করেছি। মিরপুরেই সবচেয়ে বেশি বুদ্ধিজীবী হত্যা করা হয়। সুতরাং এসব স্মৃতি সংরক্ষণ করা আমাদের দায়িত্ব।’
মিরপুর ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর দোসর রাজাকার ও বিহারি সম্প্রদায়ের ঘাঁটি। মিরপুর মুক্ত হতে সময় লাগে অতিরিক্ত ৪৫ দিন। ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি মিরপুরে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা ওড়ে। এই হত্যাযজ্ঞ আর দেশের মেধাবী সন্তানদের স্মরণে নির্মিত বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধও এই মিরপুরেই।