রোজিনা ইসলাম | আগস্ট ০৭, ২০১৫ | English Version

প্রার্থী আওয়ামী লীগের একজন সক্রিয় কর্মী। স্কুলজীবন থেকে শুরু করে ছাত্রলীগের সহসভাপতি হিসেবে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছে।’ ‘সে আমার নির্বাচনী এলাকার আওয়ামী পরিবারের সন্তান। ওই পরিবারের সকল সদস্য আজীবন আওয়ামী লীগের সমর্থক।’ ‘এরা সবাই আওয়ামী লীগ পরিবারের সন্তান।’ ‘প্রার্থী ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত।’
ওপরের উক্তিগুলো মন্ত্রী-সাংসদদের। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসে নিয়োগের জন্য তাঁরা নিজ প্যাডে এ ধরনের নানা উক্তি লিখে পছন্দের লোকদের পক্ষে সুপারিশ করেছেন। ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এ ধরনের সুপারিশ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আধা সরকারি পত্রও (ডিও লেটার) পাঠিয়েছেন। এর বাইরে পছন্দের প্রার্থীদের চাকরি নিশ্চিত করতে ফোন করেও তদবির করা হচ্ছে।
মন্ত্রী, সাংসদ, সংসদীয় কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের এ ধরনের সুপারিশে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এভাবে সুপারিশ করাকে ‘অপরাধ’ বলেও মনে করেন তাঁরা।
জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আকবর আলি খান প্রথম আলোকে বলেন, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী নিয়োগের জন্য কোনোভাবেই মন্ত্রী বা জনপ্রতিনিধিরা এভাবে সুপারিশ করতে পারেন না। কোনো আইনে এভাবে সুপারিশ করার কথা বলা নেই। এটা সরাসরি অনিয়ম। মেধার ভিত্তিতে কোটার আওতায় এ নিয়োগ হওয়া উচিত। তিনি বলেন, যাঁরা চাকরি করবেন তাঁরা যদি দলীয় হন, বিতর্কিত হন, তাহলে বাহিনীর মনোবল ভেঙে যাবে। এ ছাড়া যোগ্যরা চাকরি পাবেন না।
এ বিষয়ে পুলিশের সাবেক দুই মহাপরিদর্শক নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। বিধিবহির্ভূত যেকোনো নিয়োগই দুর্নীতিকে উৎসাহিত করে। মেধা, স্বচ্ছতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ না হলে ‘চেইন আব কমান্ড’ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। নিয়োগের মধ্যে স্বচ্ছতা না থাকলে দক্ষ বাহিনী গড়ে উঠবে না। আর এভাবে ডিও লেটার পাঠিয়ে সুপারিশ করা তো পুরোপুরি বেআইনি ও অনৈতিক।
অসংখ্য ডিও লেটারের মধ্যে একটিতে দেখা যায়, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন সই করেছেন। তাঁর সুপারিশে বলা হয়েছে, প্রার্থী আওয়ামী লীগের একজন সক্রিয় কর্মী, তার পরিবার যুবলীগের সক্রিয় কর্মী। প্রার্থী বঙ্গবন্ধুর অনুসারী এবং তাঁর ব্যক্তিগত পরিচিত। বর্তমান সরকার ঘরে ঘরে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুত দিয়েছেন, তাই ওই প্রার্থীকে এসআই পদে নিয়োগের জন্য তিনি জোর সুপারিশ ও অনুরোধ জানান।
তবে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ডিও লেটার পাঠিয়ে সুপারিশ করার কথা অস্বীকার করেছেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘নিয়োগের জন্য ডিও লেটার দিয়ে সুপারিশ করা অপরাধ। আমি এ ধরনের কোনো সুপারিশ করিনি। এটা ভুয়া ডিও হতে পারে। যে এটি করেছে, তাকে খুঁজে বের করে গ্রেপ্তার করা হবে।’
বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী মুহাম্মদ ইমাজ উদ্দিন প্রামাণিক একাই ২৪ জনের পক্ষে ডিও লেটার পাঠিয়েছেন। এই ২৪ জনকে এসআই পদে নিয়োগ দিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করেছেন তিনি। এ বিষয়ে বক্তব্য জানার চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি।
ডাক ও টেলিযোগাযোগ, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য শওকত হাচানুর রহমান একজন প্রার্থীর পক্ষে সুপারিশে লিখেছেন, ‘সে স্কুলজীবন থেকে শুরু করে ছাত্রলীগ রামনা ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সহসভাপতি হিসেবে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছে। সে আমার নির্বাচনী এলাকার আওয়ামী পরিবারের সন্তান। ওই পরিবারের সকল সদস্য আজীবন আওয়ামী লীগের সমর্থক। এ অবস্থায় প্রার্থীকে এসআই পদে নিয়োগের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।’
নাটোরের চার প্রার্থীকে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের ফায়ারম্যান পদে নিয়োগের সুপারিশ করেছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। সুপারিশে তিনি উল্লেখ করেছেন, এঁরা সবাই আওয়ামী লীগ পরিবারের সন্তান।
জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের কোনো সুপারিশ তিনি করেননি। নিয়োগের বিষয়ে তিনি কখনো সুপারিশ করেন না। নির্দেশনা দেওয়া আছে শুধু প্রত্যয়নপত্র দেওয়ার। তিনি সেটাই করেন বলে জানান।
একইভাবে মাদারীপুরের একজন প্রার্থীকে ফায়ারম্যান পদে নিয়োগের সুপারিশ করেছেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি শুধু বিবেচনা করার সুপারিশ করেছি।’
এর আগে পুলিশ সার্জেন্ট পদে চূড়ান্তভাবে নিয়োগের জন্য ডিও লেটার পাঠিয়ে সুপারিশ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। একই পদে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করে প্রার্থীর নাম পাঠান জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এইচ এন আশিকুর রহমান, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি আবুল কালাম আজাদ, ভোলার সাংসদ নুরুন্নবী চৌধুরী, নোয়াখালীর এইচ এম ইব্রাহীম, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাংসদ আবদুল ওদুদ, কৃষি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি মকবুল হোসেন, চট্টগ্রামের সাংসদ এম আবদুল লতিফ, নোয়াখালীর সাংসদ মামুনুর রশীদ, ভূমি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য এ কে এম মাঈদুল ইসলাম।
এসব সুপারিশের ব্যাপারে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের কাছে এমন ডিও লেটার আসে, আসছে। যাঁরা সুপারিশ করেছেন, তাঁরা সবাই জনপ্রতিনিধি ও দলীয় লোক। মন্ত্রী বলেন, ‘যে কেউ সুপারিশ পাঠাতেই পারেন, কিন্তু আমাদের নিয়মের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’
এর আগে মৌলভীবাজারে পুলিশ কনস্টেবল পদে নিয়োগ দেওয়ার জন্য সুপারিশ করে ৫৫ জনের তালিকা পাঠিয়েছিলেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলী। তাঁর দেওয়া তালিকা অনুযায়ী অনেকেরই চাকরি হয়েছে।
এরও আগে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) উপসহকারী পরিচালক (ডিএডি) পদে ছাত্রলীগের ৩৭ জন নেতা-কর্মীকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এঁদের নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধার চেয়ে দলীয় বিবেচনাই বেশি প্রাধান্য পেয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রথম আলোর অনুসন্ধানে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৩৭ জনের ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়।