রোজিনা ইসলাম | আগস্ট ২৭, ২০১৫

তাঁরা নিয়মিত অফিসে আসছেন, কাজ করছেন। কিন্তু ছয় মাস ধরে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। পরিবার নিয়ে তাঁদের মানবেতর দিন কাটছে। এর ওপর এখন যুক্ত হয়েছে চাকরি হারানোর শঙ্কা।
এ পরিস্থিতিতে পড়েছেন মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে কাজ করা ৩২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে কাজ করলেও তাঁরা প্রেষণে এসেছেন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ থেকে। মুক্তিযোদ্ধা সংসদকে দেখভাল করে মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক মন্ত্রণালয়। ২০০২ সালে এই মন্ত্রণালয় গঠনের পর চাহিদার ভিত্তিতে তাঁদের মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। তবে তাঁদের চাকরি রাজস্ব খাতে নেওয়া হয়নি। অথচ এ সময়ে মন্ত্রণালয়ে স্থায়ীভাবে জনবল নিয়োগ করা হয়েছে। এখনো নিয়োগ-প্রক্রিয়া চলছে।
এই ৩২ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতা বন্ধ হলেও এখন তাঁদের দায়িত্ব নিতে চাইছে না মন্ত্রণালয় বা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কেউ। মন্ত্রণালয় বলছে, তাঁরা সংসদের নিয়োগ দেওয়া। আর সংসদ বলছে, তাঁরা কাজ করছেন মন্ত্রণালয়ে, তাই মন্ত্রণালয় টাকা না দিলে তাঁদের বেতন হবে কীভাবে।
মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলেছে, ২০০২ সালে এই মন্ত্রণালয় গঠনের পর জনবল কম থাকায় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ থেকে লোক চাওয়া হয়। এরপর বিভিন্ন সময় সেখান থেকে এই কর্মচারীদের প্রেষণে মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়।
এই ৩২ জনের মধ্যে রয়েছেন সনদ শাখার ইনচার্জ, মন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, অফিস সহকারী, কম্পিউটার অপারেটর, অফিস-সহায়ক। তাঁরা বলেছেন, তাঁদের কেউ কেউ শুরু থেকে আবার কেউ তিন বছর আগে থেকে মন্ত্রণালয়ে কাজ করছেন। মন্ত্রণালয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন হাটবাজার ইজারা থেকে আয়ের চার শতাংশ বরাদ্দ দিত মুক্তিযোদ্ধা সংসদকে। সংসদ ওই টাকায় তাঁদের বেতন দিত। ২০০২ সাল থেকে তাঁরা এভাবে চেকের মাধ্যমে বেতন-ভাতা পেয়েছেন। ২০০৮ সালে ওই বরাদ্দ কমিয়ে ২ শতাংশ করা হয়। ওই বেতনে চলেছে তাঁদের সংসার, বাসা ভাড়া ও সন্তানদের লেখাপড়া। কিন্তু ছয় মাস আগে হঠাৎ করে মন্ত্রণালয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদকে ওই বরাদ্দ বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে বন্ধ হয়ে গেছে তাঁদের বেতন। এতে কারও কারও সন্তানদের লেখাপড়া বন্ধ হয়েছে, কেউ পরিবার পাঠিয়ে দিয়েছেন গ্রামে। গত ঈদে তাঁরা বেতন-উৎসব ভাতা কিছুই পাননি। এই ঈদেও বেতন-উৎসব ভাতা পাবেন কি না, এখনো জানেন না।
গত মঙ্গল ও গতকাল বুধবার মন্ত্রণালয়ে গেলে ওই কর্মচারীদের কাজে ব্যস্ত দেখা যায়। তাঁরা বেতন না পাওয়ায় মানবেতর জীবনযাপনের কথা বলেন এই প্রতিবেদককে। তাঁরা এই অবস্থার সুরাহা চান, চাকরি বহাল চান। অন্যথায় তাঁরা আন্দোলনে যাবেন বলে জানান।
ওই ৩২ জনের একজন মুক্তিযুদ্ধ সনদ শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহবুবুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা শ্রমের বিনিময়ে পারিশ্রমিক নিই। কাজে কোনো গাফিলতি নেই। এরপরও কেন আমাদের বেতন-ভাতা বন্ধ করা হলো, তা আমরা জানি না। প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী হিসেবে প্রেষণে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের শুরু থেকে কাজ করে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে হঠাৎ বেতন বন্ধ করে দেওয়ায় অসহায় হয়ে পড়েছি।’ তিনি বলেন, এ বিষয়ে ১৯ আগস্ট তাঁরা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্রধান উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছেন।
এ বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এম এ হান্নান মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কর্মচারীদের বেতন দিতে হাটবাজারের ইজারার অংশের টাকা সংসদকে দেওয়া যাবে না। নীতিমালা অনুযায়ী এ টাকা দেওয়ার কথা অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে, চিকিৎসা, শিক্ষার জন্য। বেতনের জন্য নয়।’ তিনি বলেন, ‘এমন প্রায় ১০০ জন আছেন, যাঁরা মন্ত্রণালয়ের নয়, মুক্তিযোদ্ধা সংসদের জনবল। এতজনকে প্রেষণে কেন আনা হয়েছিল, কোন প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তা আমার জানা নেই। আগে যাঁরা মন্ত্রণালয়ে দায়িত্বে ছিলেন
তাঁরা জানেন।’
এই কর্মচারীদের এখনো কাজ করার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সচিব বলেন, ‘তাঁরা চাইলে চলে যেতে পারেন, আমরা তাঁদের আটকে রাখিনি।’
মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হেলাল মোর্শেদ খান গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরকার টাকা না দিলে আমি কোথা থেকে এই কর্মচারীদের বেতন দেব। ওঁরা মন্ত্রণালয়ে কাজ করছে, ওঁদের ভালো-মন্দ দেখার দায়িত্ব মন্ত্রণালয়েরই।’
এদিকে মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বলেছে, মন্ত্রণালয়ে নতুন কর্মচারী নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। গত শুক্রবার এই নিয়োগের জন্য লিখিত পরীক্ষা হয়েছে। শনিবার থেকে মৌখিক পরীক্ষা শুরু হয়েছে।