রোজিনা ইসলাম | আগস্ট ২৫, ২০১৫

গাড়িচালকদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় মামলা না করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই ধারায় সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড। এখন থেকে সড়ক দুর্ঘটনায় কেউ নিহত হলে মামলা হবে ৩০৪(খ) ধারায়। এই ধারায় সর্বোচ্চ সাজা তিন বছর কারাদণ্ড।

স্বরাষ্ট্র ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে এ পর্যন্ত যেসব মামলা ৩০২ ধারায় করা হয়েছে, সেগুলো ৩০৪(খ) ধারায় স্থানান্তর হবে। তবে নৌপরিবহনমন্ত্রী ৩০৪ ধারায় মামলা নেওয়ার কথা বলেছেন। এই ধারায় সর্বোচ্চ সাজা ১০ বছর।
জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল প্রথম আলোকে বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার মামলা ৩০২ ধারায় করা যাবে না। এসব মামলা করতে হবে ৩০৪(খ) ধারায়। সড়ক দুর্ঘটনায় মামলা তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

Untitled

যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি ও নৌমন্ত্রী শাজাহান খান বলেন, দুর্ঘটনার মামলা ৩০২ ধারায় করা আইনসম্মত নয়। তদন্ত করার পর যদি মনে হয়, আসলেই চালকের কোনো গাফিলতি রয়েছে, তাহলে তা পরে বিবেচনা করা হবে। তবে কোনো চালকই ইচ্ছে করে দুর্ঘটনা ঘটান না।
শাজাহান খান বলেন, ‘৩০৪(খ) ধারায় যেসব মামলা হওয়ার কথা, সেগুলো হয়েছে ৩০২ ধারায়। এসব মামলায় ইচ্ছাকৃতভাবে চালকদের খুনি বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে আমরা এসব মামলার ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছি। আদালত খুলনার একটি মামলা ৩০২ থেকে ৩০৪(খ) ধারায় নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। অন্য মামলাগুলো পুনরায় তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মাধ্যমে সুপারিশ করেছি।’
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী সরকারের এ সিদ্ধান্তের কথা স্বীকার করে বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যে চুক্তি হয়েছে, সে অনুযায়ী গাড়িচালকদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় মামলা না করার
সিদ্ধান্ত হয়েছে।
যোগাযোগ করা হলে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’-এর কেন্দ্রীয় কমিটির চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন প্রথম আলোকে বলেন, ‘এভাবে ধারা বদল না করে আলাদা একটি আইন হওয়া উচিত। আমরা একটি আইন নিয়ে কাজও শুরু করেছিলাম। কিন্তু পরে আর এগোয়নি।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পরপর দুই সরকারের আমলে দায়িত্ব পাওয়া নৌপরিবহনমন্ত্রী মামলাগুলো ৩০২ থেকে ৩০৪ ধারায় স্থানান্তরসহ বেশ কয়েকটি দাবি নিয়ে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীরের কাছে গিয়েছিলেন। দেশব্যাপী পরিবহন ধর্মঘটের হুমকি টেবিলে রেখে তিনি দর-কষাকষি করেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে। তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন বলে জানা যায়।
এর ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এ-সংক্রান্ত এক উপকমিটির সভায় ৩০২ ধারায় মামলা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সরকার ও শ্রমিক ফেডারেশনের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি বাস্তবায়নে সুপারিশ প্রণয়নের জন্য এই উপকমিটি গঠিত।
ওই সভায় যত্রতত্র যানবাহনের কাগজপত্র পরীক্ষা না করা, সড়কপথে ডাকাতি হলে তদন্ত ছাড়া গাড়িচালক বা শ্রমিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়াসহ পরিবহন খাতের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো একটি প্রস্তাব আকারে পেশ করার কথা বলা হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনার মামলা ৩০২ ধারায় করার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এতে বলা হয়, দুর্ঘটনার কারণে মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে প্রায়ই দণ্ডবিধির ৩০২ ধারাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কোনো ব্যক্তি যদি হত্যার উদ্দেশ্যে সুপরিকল্পিতভাবে কোনো দুর্ঘটনা ঘটায়, সে ক্ষেত্রে হত্যার অপরাধে মামলা করা যেতে পারে। এর উদ্দেশ্য তদন্তে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত দণ্ডবিধির ৩০৪(খ) ধারায় মামলা হওয়া উচিত। তা ছাড়া গাড়িচালক সাধারণত উদ্দেশ্যমূলক ও সুপরিকল্পিতভাবে হত্যার উদ্দেশ্যে দুর্ঘটনা ঘটান না।
সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত এটিএন নিউজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মিশুক মুনীরের স্ত্রী মঞ্জুলী কাজী এভাবে ধারা পরিবর্তনের বিরোধিতা করেন। গতকাল রাতে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, শস্যের মধ্যে ভূত থাকলে যা হয়, তা-ই হয়েছে। প্রভাবশালীরা আইনকে প্রভাবিত করে অন্য ধারায় নিয়ে যাচ্ছেন। জনগণের স্বার্থ না দেখে তাঁরা চালকদের স্বার্থ দেখছেন। ৩০২ ধারায় মামলা না দেওয়ার অর্থ হচ্ছে চালকদের বিচার না হওয়া। যাঁরা এসব মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন, তাঁরা কখনোই চান না দোষীদের বিচার হোক। বিশেষ করে যিনি এ দায়িত্ব পেয়েছেন, তিনি পরিবহন নেতা।
২০১১ সালে মানিকগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় চলচ্চিত্রনির্মাতা তারেক মাসুদ, মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন নিহত হওয়ার পর অভিযুক্ত চালকের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় মামলা করার দাবি জোরদার হয়। কিন্তু নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের নেতৃত্বে সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের নেতা ও শ্রমিকেরা এই দাবির বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।