রংপুরে হেফাজতে নারী নির্যাতন ও যৌন হয়রানি

রোজিনা ইসলাম | জুন ০২, ২০১৫

২০১২ সালে পুলিশের হেফাজতে রংপুরের কাউনিয়ায় এক নারীকে নির্যাতন ও যৌন হয়রানির অভিযোগে পুলিশের তিন কর্মকর্তাকে দায়ী করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি। এর মধ্যে দুজন হলেন কাউনিয়া থানার সাময়িক বরখাস্ত হওয়া উপপরিদর্শক (এসআই) আবু বকর সিদ্দিক ও কনস্টেবল আবদুল হামিদ।
অপরজন হলেন রংপুরের পীরগাছা থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মকবুল হোসেন (বর্তমানে ঠাকুরগাঁওয়ে কর্মরত)। নির্যাতনের ঘটনায় করা মামলার আসামিদের সঙ্গে সমঝোতার জন্য বাদীকে চাপ সৃষ্টির অভিযোগের প্রমাণও পেয়েছে তদন্ত কমিটি।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে ওসি মকবুল হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাঁকে পাওয়া যায়নি।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নারী নির্যাতনের অভিযোগে পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আদালতে করা মামলা প্রত্যাহারে চাপ দেওয়া হচ্ছে এবং ওই নারীর পরিবারকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে।
নির্যাতিত নারীর ভাই ওই ঘটনায় ২০১২ সালের ৯ জানুয়ারি স্থানীয় থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা নেয়নি। পরে তিনি আদালতে মামলা করেন। পরে এ বিষয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হলে আদালত ২০১৪ সালের ৯ ডিসেম্বর বিষয়টি তদন্তের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে চলতি বছরের ৩১ মার্চ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব তৌহিদুল আলমকে প্রধান করে এক সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি তদন্ত শেষে প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে।
মন্ত্রণালয় সূত্র গত রোববার জানায়, আজ-কালের মধ্যে আদালতে কমিটির প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। কমিটি কাউনিয়ার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এলাকাবাসী ও পুলিশের সাক্ষ্য নিয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে জানতে চাইলে কমিটির প্রধান কোনো মন্তব্য করেননি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে কাউনিয়া উপজেলার রঘুনাথ গ্রামে ২০১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে পুলিশ তাঁকে নির্যাতন করে। সে সময় তাঁর বোন নির্যাতনের কারণ জানতে চাইলে পুলিশ তাঁকেও আসামি অভিহিত করে পেটায় এবং টেনেহিঁচড়ে পুলিশ ভ্যানে তুলে থানায় নিয়ে যায়। পরদিন পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় লোকজন পাঠানো হলে তাঁদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি।
পরে আদালত জামিন দেওয়ার পর ওই নারীর শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখে তাঁর পরিবার। নির্যাতনের কারণে তিনি হাঁটতে পারছিলেন না। তাঁর আরেক ভাই সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে কাউনিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করান। ওই সময় স্থানীয় মহিলা পরিষদ, নারী সংগঠন, ইউপি চেয়ারম্যানসহ এলাকাবাসী তাঁকে দেখতে এলে তিনি জানান, পুলিশ তাঁর গোপনাঙ্গে আঘাত, নির্যাতন ও যৌন হয়রানি করেছে।
তদন্ত কমিটি সূত্রে জানা গেছে, ওই ঘটনায় ২০১২ সালের ১২ জানুয়ারি কাউনিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আবু বক্কর সিদ্দিকসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন ওই নারীর ভাই। আদালত ২০১৪ সালের ১০ এপ্রিল এসআই আবু বক্করের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।
বাদী এবং ওই নারীর ভাই অভিযোগ করেন, কাউনিয়ার বরুয়াহাট এলাকার একটি মামলায় তাঁর বোনকে গ্রেপ্তার করেন কাউনিয়া থানার তৎকালীন এসআই আবু বক্কর। অথচ তিনি ওই মামলার আসামি ছিলেন না।
কমিটি তদন্ত প্রতিবেদনের পর্যালোচনা ও মতামতে বলেছে, অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যরা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলা প্রত্যাহারের জন্য ওই নারীর পরিবারকে হুমকি দিচ্ছেন। মুঠোফোনে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন এবং প্রাণনাশের হুমকিও দিচ্ছেন। আবু বকর সিদ্দিক ও আবদুল হামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এ ছাড়া ওসি মকবুল হোসেন বর্তমানে ওই নারীর পরিবারকে সমঝোতা করার জন্য চাপ দিচ্ছেন।
কমিটি এই মামলায় যেন পুলিশ কর্মকর্তারা হস্তক্ষেপ করতে না পারেন, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়াসহ এমন ঘটনা যেন আর না ঘটে সে জন্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানিয়েছে।
নাম না প্রকাশ করে ওই নারীর পরিবারের দুজন সদস্য প্রথম আলোর কাছে অভিযোগ করেন, মামলা প্রত্যাহারের জন্য তাঁদের চাপ দেওয়া হচ্ছে এবং ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে।