ভুয়া কাগজে খাদ্য অধিদপ্তরে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি

রোজিনা ইসলাম | মে ১৯, ২০১৫

ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি নেওয়ায় খাদ্য অধিদপ্তরের ১৩ জন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাঁদের চাকরিচ্যুত করার বিষয়টি জানিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সম্প্রতি চিঠি দিয়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়।
একই সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি নেওয়া ২৩১ জনের মুক্তিযোদ্ধা সনদের যথার্থতা যাচাইয়ের জন্য মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া ওই নিয়োগ কমিটিতে যাঁরা ছিলেন তাঁদের বিষয়ে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্র এসব তথ্য জানায়।
যাঁদের চাকরি থেকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তাঁরা হলেন—খাদ্যপরিদর্শক খন্দকার সেলিম হোসেন, ইসরাত জাহান, মাসুদুর রহমান, সাইদুজ্জামান, উপ-খাদ্যপরিদর্শক আনোয়ার হোসেন সিরাজী, সহকারী উপ-খাদ্যপরিদর্শক মোহাম্মদ আলাউদ্দিন, কনিকা রানী মণ্ডল, শেখ এজাজ আহমেদ, শাম্মী আখতার, বেগম ফারজানা শাহ, জাফর ইকবাল, নন্দ গোপাল রায়, আ. রহিম হাওলাদার। তাঁরা বর্তমানে বিভিন্ন জেলায় কর্মরত।
খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ফয়েজ আহমেদ ওই ১৩ জনকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্তের বিষয়টি গতকাল সোমবার প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ওই নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যাঁরা জড়িত ছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, মন্ত্রণালয়ের অধীন খাদ্য অধিদপ্তরে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ২৯৯ জনকে চাকরি দেওয়ার প্রায় চার বছর পর তাঁদের সনদের যথার্থতা যাচাইয়ের জন্য মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। নিয়ম অনুযায়ী নিয়োগের আগে তাঁদের সনদ যাচাই করা হয়নি। এ নিয়ে ‘খাদ্য অধিদপ্তর: মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ২৯৯ জনকে নিয়োগ, চার বছর পর সনদ যাচাই!’ শিরোনামে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোয় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরপর খাদ্য মন্ত্রণালয় অধিদপ্তরে চিঠি দিয়ে নিযুক্তদের মুক্তিযোদ্ধা সনদ-সংক্রান্ত সব কাগজপত্র চায়। এর মধ্যে ১২ জন কোনো সনদ দিতে পারেননি। অপর একজনের মুক্তিযোদ্ধা সনদ থাকলেও তিনি মুক্তিযোদ্ধা কোটায় আবেদন করেননি। এ ছাড়া নানা কারণে চাকরিতে যোগ দেননি ৪০ জন। এ অবস্থায় মন্ত্রণালয় প্রথম পর্যায়ে ১৩ জনকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের যাচাই-বাছাইয়ে ২৩১ জনের মধ্যে যদি কারও সনদ ভুয়া প্রমাণিত হয়, তাঁদেরও চাকরিচ্যুত করা হবে।
খাদ্য অধিদপ্তরে ২০১০ সালে খাদ্যপরিদর্শক, উপ-খাদ্যপরিদর্শক ও সহকারী উপ-খাদ্যপরিদর্শকসহ ১০ ক্যাটাগরিতে জনবল নিয়োগ করা হয়। খাদ্য মন্ত্রণালয় ও মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও পোষ্য কোটায় ৩০ শতাংশ নিয়োগ দেওয়ার প্রায় চার বছর পর গত বছরের ১২ নভেম্বর সবার সনদ যাচাইয়ের জন্য খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়।
মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গত ডিসেম্বরে চিঠিতে ২৯৯ জনের সনদ যাচাই করতে বললেও খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে ২৬৩টি সনদ পাঠানো হয়। এর মধ্যে মন্ত্রণালয়ের দেওয়া সনদ ২৫৬টি, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিস্বাক্ষরিত সনদ পাঁচটি, আতাউল গনি ওসমানীর দুটি সনদ রয়েছে। এ ছাড়া কিছু সনদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধার জাতীয় পরিচয়পত্র, মুক্তিবার্তা নম্বর, গেজেট নম্বর (সত্যায়িত ফটোকপি, প্রমাণ) সংযুক্ত করে না পাঠানোয় এগুলোর যথার্থতা যাচাই সম্ভব হয়নি। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় ৭ ডিসেম্বর এসব সনদ সঠিক যাচাইয়ের জন্য তাদের দেওয়া ছক অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ তথ্য লিপিবদ্ধ ও সংযুক্ত করে পাঠাতে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায়। পরে খাদ্য মন্ত্রণালয় ২৩১টি সনদ পাঠায়। গত কয়েক দিনে এই ২৩১টি সনদের নথি খুঁজে না পাওয়ায় যাচাই বন্ধ রয়েছে।
জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রথমবার পাঠানো অনেক সনদে থাকা স্বাক্ষর ও ধরন দেখে জাল মনে হয়েছে। আমরা এগুলো আবার যাচাই করব। সনদ যাচাই না করে কেন এঁদের চাকরি হলো বা কীভাবে হলো, তা বুঝতে পারছি না।’