দেশের সবচেয়ে প্রাণঘাতী শিল্প দুর্ঘটনা সাভারের রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় সরকারি ও পুলিশি তদন্তে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিলের অনুমতি দিচ্ছে না শ্রম মন্ত্রণালয়। অথচ শ্রম মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব তদন্তেই আটজন কর্মকর্তাকে দায়ী করা হয়েছিল। পরে পুলিশ তদন্ত করে তাঁদের মধ্যে চারজনকে ফৌজদারি মামলায় অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়।
নিয়মানুযায়ী, সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য অনুমতি নিতে হয়। তদন্তকারী সংস্থা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) শিল্প মন্ত্রণালয়ের কাছে সেই অনুমতি চেয়ে পাচ্ছে না। মন্ত্রণালয় অনুমতি প্রত্যাখ্যানের কারণ জানিয়ে শিগগিরই সিআইডিকে চিঠি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
যে চারজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এ অনুমতি মিলছে না তাঁরা হলেন শ্রম মন্ত্রণালয়ের কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন দপ্তরের উপমহাপরিদর্শক মো. ইউসুফ আলী ও শহিদুল ইসলাম, ঢাকা বিভাগীয় কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান দপ্তরের যুগ্ম শ্রম পরিচালক এম এ জামসেদুর রহমান এবং টঙ্গীর শ্রম মন্ত্রণালয়ের প্রশিক্ষণকেন্দ্র (আইআরআই) প্রকল্পের পরিচালক বেলায়েত হোসেন।
সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, তদন্তের পর রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় শ্রম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাসহ মোট ১৩ জন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। অন্যরা হচ্ছেন পৌরসভার সাবেক মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা উত্তম কুমার রায়, সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কবির উদ্দিন সরদার, সাভার পৌরসভার সাবেক মেয়র রেফাতউল্লাহ, কাউন্সিলর মোহাম্মদ আলী খান, সাভার পৌরসভার সাবেক সহকারী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান ও উপসহকারী রকিবুল হাসান, প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম ও ফারজানা ইসলাম। তাঁদের সবার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিলের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমতি লাগবে।
জানতে চাইলে সিআইডির অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোখলেসুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘শ্রম মন্ত্রণালয়ের চিঠি পেলেই আমরা এ বিষয়ে কিছু বলতে পারব। তদন্তাধীন বিষয়ে এর বেশি মন্তব্য করা ঠিক হবে না।’
আর শ্রমসচিব মিকাইল শিপার প্রথম আলোকে বলেন, ‘না, আমরা মামলা করার অনুমতি দেব না। রানা প্লাজা ধসের ঘটনার জন্য কর্মকর্তারা দায়ী নন।’ তিনি আরও বলেন, শ্রম আইন, ২০০৬ এবং এ আইনের আওতাধীন ১৯৭৯ সালের কারখানা বিধিমালার অধীনে সম্পাদিত কোনো কাজের যথার্থতা বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করে ফৌজদারি কার্যধারা গ্রহণ করার আইনত কোনো সুযোগ নেই। তিনি অবশ্য তাজরীনের দুর্ঘটনায় এ ধরনের অনুমতি দেওয়ার কথা স্বীকার করেন। তবে তিনি বলেন, ‘সে সময় আমরা দুজন কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা পেয়েছিলাম।’
শ্রম মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২০০৬ সালের শ্রম আইনের ৬১, ৮৫, ৩১৯ ও ৩২৬ ধারা এবং ১৯৭৯ সালের এ বিধিমালার ৩, ৪, ৫ ও ৩৮ ধারা অব্যাহতভাবে লঙ্ঘন করা হয়েছে। বিশেষ করে তৃতীয় তলায় ফাটল ধরার বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারের পরও ঢাকা বিভাগীয় কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন দপ্তর কারখানা বন্ধের কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তদন্ত কমিটি একে বড় ধরনের অপরাধ বলে মনে করেছে। ওই প্রতিবেদনে মন্ত্রণালয়ের আটজন কর্মকর্তাকে রানা প্লাজার ঘটনার জন্য দায়ী করা হয়েছিল এবং নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানকে দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তাঁদের বরখাস্তও করা হয়। কিন্তু পরে বরখাস্তের সেই সব আদেশ বাতিল করা হয়।
সাবেক শ্রম পরিদপ্তরের পরিচালক খুরশিদুল আলমের নেতৃত্বাধীন ওই কমিটি গত বছরের ৮ জুন তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়।
পরবর্তী সময়ে সিআইডির প্রতিবেদনে শ্রম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলা হয়, জামসেদুর রহমান ও বেলায়েত হোসেন রানা প্লাজা ভবনের ছয়তলার ওপর অবৈধভাবে নির্মিত সপ্তম ও অষ্টম তলার পোশাক কারখানার মেশিনের লে-আউট নকশা ও ভুয়া স্থাপত্য নকশা অনুমোদন করেছিলেন। উল্লিখিত দুটি ফ্লোরসহ তৃতীয় তলায় বৈদ্যুতিক জেনারেটর স্থাপন করা হয়েছিল। অন্য দুই কর্মকর্তা ইউসুফ আলী ও শহিদুল ইসলাম রানা প্লাজা ভবনের পোশাক কারখানার ফ্লোরগুলো বাণিজ্যিক হওয়া সত্ত্বেও যথাযথভাবে পরিদর্শন না করে এবং মেশিন লে-আউটে নকশার কারিগরি দিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে পোশাকমালিকদের লাইসেন্স দেওয়ার সুপারিশ করেছেন। এই কর্মকর্তাদের লে-আউট নকশায় অবৈধভাবে স্থাপিত জেনারেটর রানা প্লাজার ধসকে ত্বরান্বিত করেছে। এ ছাড়া ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হলেও সাভার এলাকার পরিদর্শক শহিদুল ইসলাম কারখানা বন্ধ রাখার নোটিশ জারি ও মালিকদের সতর্ক করেননি।
ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯৭ ধারা অনুযায়ী, সরকারি কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে কোনো অপরাধ প্রমাণিত হলে তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিলের আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা দপ্তরের অনুমোদন লাগে। রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিও তদন্তকারী সংস্থা সিআইডিকে এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিতে বলেছেন।
সিআইডি গত ২৪ আগস্ট চারজন কর্মকর্তার নাম অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্তির অনুমোদন চেয়ে শ্রমসচিবের কাছে চিঠি পাঠায়। কিন্তু এখন শ্রম মন্ত্রণালয়ই বলছে, আইনগতভাবে মন্ত্রণালয় এই কর্মকর্তাদের দায়ী করতে পারে না। তাদের যুক্তি, যেসব কারণে রানা প্লাজা ধসে পড়েছে, তার কোনোটির সঙ্গেই কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততা ছিল না। তাই এ মামলায় শ্রম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের অভিযুক্ত করার জন্য সরকারি মঞ্জুরি আদেশ দেওয়া সম্ভব নয়।
শ্রম মন্ত্রণালয় আরও বলছে, শ্রম আইন বা বিধিমালার বাইরে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের পোশাক কারখানা নির্মাণ ও সম্প্রসারণে পূর্ব অনুমতি, লাইসেন্স প্রদান ও নবায়নের কোনো এখতিয়ার পরিদর্শক বা কর্মকর্তাদের নেই। শ্রম আইন অনুযায়ী কোনো বহুতল ভবনের কোনো তলার কারখানা স্থাপনে আইনগত বাধা নেই। ফলে বাণিজ্যিক ফ্লোরকে কারখানার ফ্লোর বানানোর অভিযোগ ঠিক নয়। এ ছাড়া রানা প্লাজার তৃতীয় তলা থেকে ওপরের তলায় পোশাক কারখানা হিসেবে ব্যবহার করার অনুমতি দিয়ে কর্মকর্তারা আইন ও নিয়মের ব্যত্যয় করেননি। এ ছাড়া পরিদর্শকেরা শুধু কারখানারা লে-আউট প্ল্যান বিবেচনা করে অনুমোদন করেন, মূল স্থাপত্য নকশা বিষয়ে পরিদর্শকদের কিছু করার নেই। পোশাক কারখানায় জেনারেটর স্থাপন বা ব্যবহার করা হবে কি না, তা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট ভবনের স্থাপত্য নকশা ও নির্মাণের ওপর। এ দুটি বিষয় কারখানা পরিদর্শকের এখতিয়ারবহির্ভূত। কারখানা পরিদর্শনের কোনো নির্দেশনা শ্রম আইন, ২০০৬ এবং কারখানা বিধিমালা ১৯৭৯তে ছিল না। বিধিমালা অনুযায়ী মালিক ও ব্যবস্থাপকের ফাটল দেখার বিষয়টি পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে পরিদর্শককে জানানোর কথা।
শ্রম মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব তদন্তে এসব কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করার বিষয়ে তাঁদের যুক্তি, তদন্ত কমিটি ঘটনার আকস্মিকতা ও বিপুলসংখ্যক প্রাণহানির ঘটনায় বাস্তবতার চেয়ে অনেক বেশি আবেগের বশবর্তী হয়ে তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছিল। প্রকৃতপক্ষে রানা প্লাজার পাঁচটি কারখানার লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে শ্রম আইনের কোনো বিধান লঙ্ঘিত হয়নি। তাঁরা বলছেন যে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাঁদের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়ে বিভাগীয় মামলা নিষ্পত্তি করা হয়েছে।
গত বছরের ২৪ এপ্রিল ধসে পড়ে সাভারের রানা প্লাজা, যাতে অন্তত এক হাজার ১৩৪ জন নিহত হন। আহত ও পঙ্গু হয়ে যান প্রায় দুই হাজার মানুষ। মর্মান্তিক এ ঘটনা নিয়ে পাঁচটি মামলা হয়।