রোজিনা ইসলাম | তারিখ: ২৫-০৩-২০১১
আন্তর্জাতিক মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও তদন্ত সংস্থার এক বছর পূর্ণ হলেও কাজে গতি আসেনি। জনবলসংকট ও কারিগরি সহযোগিতার অভাবে বিচার-প্রক্রিয়া আশানুরূপ এগোতে পারেনি।
তবে তদন্ত সংস্থা আশা করছে, ২০ এপ্রিলের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া সম্ভব হবে। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল জানাতে পারেননি, কবে নাগাদ বিচার শুরু হবে।
গত বছরের ২৫ মার্চ বেশ ঢাকঢোল পিটিয়ে ট্রাইব্যুনাল গঠন করে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের আনুষ্ঠানিক বিচার-প্রক্রিয়া শুরু করে সরকার। ওই দিন ঘোষণা করা হয়েছিল ট্রাইব্যুনাল, তদন্ত সংস্থা ও আইনজীবী প্যানেল। এর পর থেকে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা বিভিন্ন সভা, সেমিনার, সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, স্বাধীনতার ৪০ বছরে মার্চেই মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে।
যোগাযোগ করা হলে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নির্বাহী সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন, গণহত্যার ভয়াবহতা, ব্যাপকতা, বিচারের জন্য যে রসদ, লোকবল, অর্থ ও যোগ্য আইনজীবী প্রয়োজন, সে সম্পর্কে সরকারের কোনো ধারণাই নেই। এ কারণে বিচার-প্রক্রিয়ায় কোনো গতি নেই।
শাহরিয়ার কবির প্রথম আলোকে আরও বলেন, ট্রাইব্যুনাল এখন ঠুঁটো জগন্নাথ। ট্রাইব্যুনালের জন্য যে সংখ্যক সৎ ও দক্ষ আইনজীবী প্রয়োজন, তা-ও নেই। আর জনবল ও স্থানসংকট তো আছেই। অন্যদিকে বিচার বানচাল ও প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের বিদেশি সহযোগীরা যে তৎপরতা শুরু করেছে, তা সামাল দেওয়ার জন্য নেই কোনো কূটনৈতিক তৎপরতা। সম্ভাব্য সাক্ষীদের অনেকেই মারা গেছেন, যাঁরা বেঁচে আছেন তাঁদের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য একটি আইন করার কথা বলা হচ্ছে। তা-ও করতে পারেনি আইন মন্ত্রণালয়। তা ছাড়া চিহ্নিত অপরাধী গোলাম আযমকেও এক বছরে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
তদন্ত সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত ও প্রমাণ সংগ্রহ করতে না পারায় একদিকে যেমন বিচার-প্রক্রিয়া ঝিমিয়ে পড়ছে, অন্যদিকে জনবল ও কারিগরি সহায়তা না পাওয়ায় পুরো তথ্যও সংগ্রহ করা যাচ্ছে না।
তদন্ত সংস্থার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল হান্নান গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, এত সংকট নিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা সহজ নয়। এক বছরে এসেও জনবল, সংস্থার সদস্যদের বাসস্থানসহ অনেক সংকট রয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘আমি এসে প্রায় প্রতিদিনই মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠাচ্ছি লোকবল ও কারিগরি সহায়তা চেয়ে। তবে এখন কিছুটা সংকট কেটেছে। আশা রাখি, ২০ এপ্রিলের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারব। কিন্তু এর পরও বিচার-প্রক্রিয়া শুরু করতে অনেকগুলো ধাপ শেষ করতে হবে।’
গোলাম আযমকে গ্রেপ্তার করার বিষয়ে তদন্তপ্রধান বলেন, তথ্যপ্রমাণ ছাড়া কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব নয়। তবে এপ্রিলের মধ্যে এ বিষয়ে এগোনো যাবে।
আইনজীবী প্যানেলের প্রধান গোলাম আরিফ টিপু প্রথম আলোকে বলেন, ‘অগ্রগতি কেমন করে হবে! জনবলসংকট থেকে শুরু করে কারিগরি সহযোগিতা ট্রাইব্যুনাল কতটুকু পাচ্ছে, তা আপনারা এসে কখনো খোঁজ নিয়েছেন। আপনাদের (সংবাদপত্র) উচিত ছিল, এত বড় জাতীয় কাজ সম্পর্কে দুর্বলতাগুলো তুলে ধরা।’
বিচার কবে নাগাদ শুরু হবে জানতে চাইলে গোলাম আরিফ বলেন, ‘যেদিন হবে, সেদিন হবে। আমি কোনো দিনক্ষণ বলতে চাই না।’
ট্রাইব্যুনাল ও তদন্ত সংস্থা কী চায়: সূত্রমতে, নিবিড়ভাবে পড়াশোনা ও পর্যালোচনার জন্য প্রধান গবেষক, কম্পিউটার, মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রমাণের জন্য পর্যাপ্ত বই ও প্রকাশনা, প্রতিবেদন, দেশি-বিদেশি বই চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়। গাড়িচালক, পুলিশ ইন্সপেক্টর এবং ভ্রমণকালে জেলার পুলিশ সুপার ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সার্বিক সহায়তা ও নিরাপত্তা, ঝুঁকি ভাতাসহ আরও কিছু আছে চাওয়ার তালিকায়।
জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ বলেন, সরকার মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের ব্যাপারে অনেক আন্তরিক। এ বিষয়ে কারও কোনো সন্দেহ থাকা ঠিক নয়। কিন্তু সুষ্ঠু তদন্তের জন্য সঠিক তথ্যপ্রমাণের দরকার, যা সংগ্রহে তদন্ত সংস্থা কাজ করছে। বিচার-প্রক্রিয়া যাতে স্বচ্ছ এবং আন্তর্জাতিক মানের হয়, তা নিশ্চিত করতে কিছুটা সময় লাগছে।
সূত্র জানায়, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু করতে আন্তর্জাতিকভাবে উল্লেখযোগ্য সাড়া পায়নি সরকার। তথ্যপ্রমাণ, দলিল বা কোনো চিঠিপত্র থাকলে তা দিয়ে সহায়তা করতে বিভিন্ন দেশে চিঠি পাঠানো হয়েছিল। স্থিরচিত্র ও ভিডিও এবং পেপারকাটিংসহ যেকোনো ধরনের তথ্য থাকলে তা-ও চাওয়া হয়।
ট্রাইব্যুনাল: গত বছরের ২৫ মার্চ বিচারপতি নিজামুল হকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবীর ও এ কে এম জহির আহমেদ। এ ছাড়া নিয়োগ দেওয়া হয় প্রসিকিউটর (আইনজীবী) ও তদন্ত কর্মকর্তা। পুরাতন হাইকোর্ট ভবনে স্থাপিত হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ২৮ মার্চ আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে ট্রাইব্যুনাল। তবে স্থানসংকুলান না হওয়ায় গত ৪ জুলাই বেইলি রোডে তদন্ত সংস্থার কার্যালয় স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে ৩৯/এ বেইলি রোডের মিনিস্টার্স অ্যাপার্টমেন্ট ভবন-২-এর পঞ্চম তলায় বসে কাজ করছেন সংস্থার সদস্যরা। ওখানে আইনজীবীদের কার্যালয়ও আছে।
তদন্ত কার্যক্রম: মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ রয়েছে এমন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহের কাজ করছে তদন্ত সংস্থা। যাত্রা শুরুর পর আইনজীবী ও তদন্ত সংস্থার সদস্যরা ঢাকার বাইরে প্রথমে খুলনার চুকনগরে যান তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহের জন্য। এরপর তদন্ত সংস্থা ও আইনজীবী প্যানেলের (প্রসিকিউটর) সদস্যদের সমন্বয়ে প্রতিনিধিদল খুলনা, চট্টগ্রাম, পিরোজপুর, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ জেলায় যায়। পরে শেরপুর, কুমিল্লা, বাগেরহাট ও পাবনা যায়। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, জাতীয় জাদুঘর, বাংলা একাডেমী থেকে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছে তদন্ত সংস্থা।
সরকারের প্রতিশ্রুতি: আওয়ামী লীগ তার নির্বাচনী ইশতেহারে যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছিল। যদিও নির্বাচনের আগে থেকে সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি এবং মহাজোটের শরিক বাম দলগুলো যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য আন্দোলন করছিল।